ঘুষ দুর্নীতির সুযোগ কম কাজের গতিও কম

যশোরের অফিসপাড়ার খবর

0

তহীদ মনি ॥ ‘তোষণে তুষ্টি’ নীতিতে চলা সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কাজ করতে যেয়ে খেই হারিয়ে ফেলছেন। কাকে সন্তুষ্ট করে চলবেন, কার নির্দেশ মানবেন এসব ভাবতে ভাবতেই তাদের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তদবিরবাজদের দৌরত্ম্য না থাকায় কাজে গতিই পাচ্ছেন না অনেকেই। ঘুষ-দুর্নীতির সুযোগ কম থাকায় সেবা গ্রহীতাদের কাজও কম হচ্ছে। যশোরের সরকারি অফিসগুলো ঘুরে এ অবস্থা দেখা গেছে। আর কর্মকর্তা কর্মচারীরা কাজ না করায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সেবা গ্রহীতাদের। অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শতভাগ কাজ করার চেষ্টা চলছে। অযথা খবরদারির কেউ না থাকায় স্বাচ্ছন্দে কাজ হচ্ছে।

৫ আগস্টের আগে ফ্যাসিস্ট সরকারের লোক বা দলীয় পদপদবীধারীদের দাপট রক্ষায় ব্যস্ত থাকতেন সরকারি অফিসের কর্মকর্তারা। এখন সেই ব্যস্ততা না থাকলেও কে খুশি হবে, কে অখুশি হবে এই চিন্তায় কাজের গতিই পাচ্ছে না তারা। ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা বোর্ড অফিস, হাউজিং অফিস, সিভিল সার্জন অফিস, শিক্ষা অফিস, উপজেলা পরিষদ, স্বাস্থ্য বিভাগসহ শহরের বেশ কয়েকটি অফিসের গত এক মাসে অন্তত ১০ জন ভুক্তভোগীর কথা অনুসারে এই চিত্র পাওয়া যায়। সেবা গ্রহীতারা বলছেন, ঘুষ-দুর্নীতি কম, কাজের গতিও হচ্ছে কম।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি আলমগীর নামে উপশহরের একজন সেবা গ্রহীতা হাউজিং অফিসে গিয়ে জানতে পারেন কর্মকতর্তারা কেউ নেই। অফিস সহকারী অজিম জানান, স্যাররা ডিসি অফিস ও এসপি অফিসে গেছেন, আজ কোনো কাজ হবে না। পরের দিন মঙ্গলবার ওই অফিসে সরেজমিনে দেখা গেল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার একটি দল অবস্থান করছে।

তারা জানালেন, পর পর দুই দিন এসে অফিসের কাউকে তারা পাচ্ছেন না, আলাপ করতে চেয়ে ফোন দিলেও ধরছেন না। নজরুল নামে একজন ভুক্তভোগী গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, ‘শহরের ভূমি অফিসে কাজ নিয়ে গেলে নানা সমস্যা দেখিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন, সমাধানের পথও বলেননি সংশ্লিষ্টরা। তিনি আরো বলেন, অতীতে তার জমিজমার এমন কাজ নিয়ে গেলে টাকা পয়সার ডিমান্ড থাকতো, ঝামেলা এড়াতে কাজ করিয়ে নিয়েছেন, এখন কাজও করছেন না, লম্বা পথ দেখাচ্ছেন’।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সরকারি কর্মচারী জানিয়েছিলেন, বদলিজনিত কারণে গোপনীয় অনুবেদনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পাদন সংক্রান্ত কাজে দুইদিন সিভিল সার্জন অফিসে গিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নেই বলে দুইবার গিয়ে ফিরে আসার পরদিন কাজটা পেয়েছেন।

সম্প্রতি একটি সরকারি অফিসের এক কর্মকর্তার কাছে ফাইল স্বাক্ষর করাতে যান এসএসআর এন্টারপ্রাইজের রফিকুল ইসলাম। অফিসে তখন সাংবাদিকসহ কয়েকজন সেবা গ্রহীতা বসেছিলেন। স্বাক্ষরের পর রফিকুল ইসলাম অফিসের ওই কর্মকর্তাকে বললেন,‘একটু অপেক্ষা করবো না আপনি একটু বাইরে আসবেন?’ কর্মকর্তা জানতে চান তার আর কোনো কাজ আছে কিনা, তিনি জানান, ‘না তবে’..একটু আমতা আমতা করতে থাকলে ওই কর্মকর্তা তাকে ধমক দিয়ে জানান, আপনি অতীত অভিজ্ঞতা ভুলে যান, কাজে সমস্যা থাকলে জানাবেন, করে দেবো। এ সময় রফিকুল জানান, ‘সব অফিসেই তো এমন সিস্টেমে চলতে হয়েছিল আমাদের।’

যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনেক কর্মকর্তা বদলি হয়েছেন সম্প্রতি। সেখানেও সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে। আবার কর্মচারীদের মধ্যে নতুন কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে ও নানাভাবে অজুহাত দেখিয়ে ফাঁকি দিয়ে সময় পার করার প্রবণতা দেখা গেছে। তাছাড়া, যশোর শিক্ষা বোর্ডে বিগত সরকারের সময়ে নির্বাচিত সিবিএ নেতারা বহাল রয়েছেন দাবি করে তারা কাজের গতি বন্ধ করতে চাইছেন বলেও অভিযোগ শ্রমিকদলের একাধিক জনের। সব মিলিয়ে কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলেও জানান কেউ কেউ। তাছাড়া বিভিন্ন সরকারি অফিসে গেলে ‘বড় স্যার নেই’ ‘বাইরে গেছে’ ‘ফিল্ডে গেছে’ ডিসি অফিসে গেছে’ এ সব ধরণের কথা প্রায়শই সেবা গ্রহীতাদের শুনতে হচ্ছে।

তবে বিভিন্ন সরকারি অফিসে কিছু কাজের চাপ বেড়েছে বলেও একাধিক কর্মকর্তা জানান। উদাহরণ হিসেবে বলেন, বর্তমানে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। তার উপর রয়েছে নিজ অফিসের প্রশাসনিক দায়িত্ব। একটি উপজেলায় শতাধিক স্কুল কলেজ মাদ্রাসা থাকে। সে সব প্রতিষ্ঠানের ফাইল মাসে একবার হলেও তাকে দেখা লাগে। সমস্যা হলে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা লাগে। অনেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান না থাকায় প্রশাসকের মাধ্যমে সেখানেও তাকে কাজ করতে হয়। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিভিন্ন কমিটিতে উপদেষ্টা ও কমিটির সভাপতির দায়িত্বে থাকতেন। তারা না থাকায় উপজেলা প্রশাসক হিসেবে সব কমিটির দায়িত্ব এখন উপজেলার নির্বাহী অফিসারকেই সামলাতে হচ্ছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানসহ নানা জনের লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ শোনা এবং সেগুলোর সমাধানও অনেক ক্ষেত্রে ইউএনওকেই করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে গতি ও সেবা ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মতে, ঘুষ বা উঢৌকন এখন ততটা সরাসরি দেখা যাচ্ছে না।

এসব বিষয়ে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা জানান, তার এবং তার আওতায় উপজেলা পর্যায়ের অফিসে এখনো হয়তো কাক্সিক্ষত গতি আসেনি। তবে খুব শিগগিরই সে ধারায় ফিরতে পারবেন।

তিনি জানান, দুর্নীতির বিষয়টি আপেক্ষিক। তারপরও অতীতের মতো অত ভয়ঙ্কর চেহারায় তিনি এখনো দেখতে পাননি বা তার নজরে আসেনি। তিনি স্বীকার করেন, ৫ আগস্টের পরে অনেকের মধ্যে গাছাড়া ভাব হয়েছিল। বর্তমানে অফিস কর্মমুখী হয়েছে, পরিবর্তন এসছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, সম্পূর্ণ গতিশীল ও পরিবর্তন আসতে একটু সময় লাগবে হয়তো।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রধান কাজ হচ্ছে সরকারের নির্দেশ মতো কাজ করা। জনসেবা দেয়া। ৩৬ জুলাইয়ের (৫আগস্ট) পর সরকারি সব অফিসে সম্পূর্ণ জনআকাক্সক্ষা ও বর্তমান সরকারের চাহিদা বাস্তবায়িত হয়েছে এটা বলা যাবে না। তবে পরিবর্তন এসেছে এটা স্বীকার করতে হবে।

তিনি জানান, দীর্ঘদিনের যে ধারা তা রাতারাতি ভাঙা যায় না। এছাড়া নতুন নতুন অফিসে নতুন নতুন কর্মকর্তা, নতুন পরিবেশ হয়তো কিছুটা সময় লাগবে। যারা এর সাথে তাল মেলাতে পারবে না তাদের স্বরূপ হয়তো সহজেই জনগণের কাছে ধরা পড়বে। তারপরও অতিতের ধারাবাহিকতা থেকে অনেকেই বেরিয়ে এসে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাজ শুরু করেছে।

যশোর জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, এসিল্যান্ড অফিস শতভাগ আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। জনআকাক্সক্ষা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের আশা আকাক্সক্ষা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রশাসন গতিশীল রয়েছে। এরপরও কোনো সরকারি অফিসে গতিশীলতার ও জনসেবার ঘাটতি পরিলক্ষিত হলে তিনি সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সেবা গ্রহীতাদেরকে তাকে জানানোর অনুরোধ করেছেন।

তিনি আরো জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের বদলি, পদায়নসহ নানা পরিবর্তন রয়েছে। অনেকেই নতুন অফিসে নতুনভাবে কাজ করছেন, কোথাও কোথাও সাময়িক সমস্যা হয়তো হচ্ছে তা ঠিক হয়ে যাবে।