যশোরে পুলিশের নিক্রিয়তায় সক্রিয় অপরাধী চক্র

0

 

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পুলিশ আছে থানায়। পুলিশ ঘুরছে রাস্তায়। পুলিশ যাচ্ছে অপরাধ সংঘটন স্থলেও। তবুও পুলিশের কোন সহযোগিতা পাচ্ছে না জনসাধারণ। তারা পুলিশ পেলেও পাচ্ছে না সক্রিয় পুলিশ। পুলিশের এ নিক্রিয়তায় সক্রিয় হয়ে উঠছে অপরাধী চক্র। ফ্রি স্টাইলে চলছে অপরাধ। যশোরে প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরি ছিনতাই। মাদক স্পটগুলো এখন ওপেন সিক্রেট। নাগরিকদের কেউ কেউ হাতে তুলে নিচ্ছে আইন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উপকারী পুলিশ হতে একটু সময় লাগবে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসন আমলে জেলার বিভিন্ন থানা এবং ফাঁড়ি অথবা ক্যাম্পে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী মতের লোকজনকে ধরে অর্থবাণিজ্য চালিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িতদের সাথে পুলিশের সখ্যতা ছিল। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কথামত পুলিশ বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ধরে এনে মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন স্থানের মত যশোরের জনরোষের শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল পুলিশের। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে জেলার কোথাও পুলিশ আক্রান্ত হয়নি। পুলিশ স্টেশনগুলোও ছিল নিরাপদ। যশোর কখনো পুলিশ শূন্য হয়নি। এরপরেও পুলিশের সক্রিয় কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। এমনকী যশোর শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহলও বন্ধ রয়েছে। অপরাধী এবং ওয়ারেন্টের আসামি গ্রেফতারেও মাঠে নেই পুলিশ। পুলিশের এ নিক্রিয়তার সুযোগে চাকুবাজ, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরচক্রের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিভিন্ন স্থানে তাদের চাকুর আঘাতে লোকজন জখম হচ্ছেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে হাসিনা বেগম নামে এক নারী জখম হয়েছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর ঝুমঝুমপুর এলাকায় দুবর্ৃৃত্তরা মানিক নামে এক চালককে ছুরিকাঘাত করে তার রিকশা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। একইদিন দড়াটানার ইকোপার্কে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আতিক নামে এক যুবক জখম হন। গত ৯ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার বাদিয়াটোলা গ্রামে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রবাসী মেহের আলী এবং আড়পাড়ায় জাহাঙ্গীর আলম মিঠু নামে এক যুবককে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে। গত ২৮ আগস্ট সদর উপজেলার গোয়ালদা মাইতুল হক জামে মসজিদের সামনে থেকে খতিব ওমর আলীর মোটরসাইকেলটি চুরি হয়ে যায়। গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে শহরের মুজিব সড়ক থেকে মেহেদী হাসান শোভন নামে এক ব্যক্তির একটি এফ জেড মোটরসাইকেল দুর্বৃত্তরা চুরি করে নিয়ে যায়। গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে পুলেরহাটের নিজ বাসার গ্যারেজ থেকে মারুফ আলম নামে এক যুবকের একটি সুজুকি মোটরসাইকেল চুরি হয়ে যায়। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের পুরাতন কসবা এলাকা থেকে ডিএসবিতে কর্মরত পুলিশের এসআই মাহফুজুর রহমানের একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়।
যশোর শহরের বারান্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন জানান, গত রোববার লিচুতলায় প্রকাশ্যে চাকু মারার ঘটনা ঘটেছে। আক্রান্ত পক্ষ গেছে হাসপাতালে আর আক্রমনকারীকে ধরে জনগণ গণপিটুনি দিয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও কোন ভূমিকা নেয়নি। ফলে আইন হাতে তুলে নেয়ার মত অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে জনসাধারণ।
শহরের বাইক চালক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় থাকলেও কোন অভিযান চালাচ্ছে না। কোন কিছু নিয়ন্ত্রণও করছে না। সবাই চলছে নিজের ইচ্ছেমত। রাত ৮ পর শহরের রাস্তা পুলিশ শূন্য হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। চলাচল করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, পুলিশের নিক্রিয়তায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় মাদক কারবারীরা। শহরের বারান্দীপাড়া, উপশহর, বিরামপুর, চাঁচড়া রায়পাড়া তুলোতলা, শংকরপুরসহ প্রায় সব মাদক স্পট এখন ওপেন। মাদক কারবারীরা যে সকল আওয়ামী লীগ নেতার মাধ্যমে থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেছিল তারা শুধু আড়ালে চলে গেছে। কারবারীদের এখন বাড়তি খরচ হচ্ছে না। বরং ব্যবসা ভালো চলছে।
শহরে ভিন্ন নাম পরিচয়ে অপরাধী চক্র চাদাবাজি শুরু করেছে বলেও ব্যবসায়িদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন।
পুলিশ মাঠে না থাকা এবং অপরাধ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির যশোর জেলা শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান জানান, পুলিশ এতোদিন এক ধারায় চলছিলো। এখন সবকিছু উল্টে গেছে। এ কারণে পুলিশ বুঝে উঠতে পারছেনা কী ধারায় তারা কাজ করবে। আবার কোনো কোনো পুলিশ হয়ত ইচ্ছে করে কাজ করছেনা। তবে পুলিশকে অবশ্য আমাদের প্রয়োজন। পুলিশ মাঠে না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। তিনি বলেন, পুলিশকে এখন নতুন ধারায় কাজ করতে হবে। এ জন্য পুলিশকে একটু সময় দেওয়া দরকার।
নবাগত পুলিশ সুপার জিয়াউদ্দিন আহমেদ রোববার সাংবাদিকদের বলেন, জাবীর হোটেলের ঘটনাটি না ঘটলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানে যশোর একটি মডেল হয়ে থাকতো। এ জেলার কোথাও পুলিশ আক্রান্ত হয়নি। এরপরও পুলিশ ভয় পাচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশের ভয় দূর করার চেষ্টা চলছে। তিনি নিজে ক্যাম্পে গিয়ে পুলিশের সাথে কথা বলেছেন। তাছাড়া পুলিশ সদস্যদের কর্মস্থল পরিবর্তনেও তিনি কাজ করছেন।
পুলিশ সুপার আশা করেন অবশ্যই জনবান্ধব হবে। মানুষের নিরাপত্তা দিতে অচিরেই মাঠে সক্রিয় হবে।