দখল-দূষণে শোচনীয় ভৈরব

0

নজরুল ইসলাম মল্লিক, অভয়নগর (যশোর)॥ দক্ষিণাঞ্চলের ব্যস্ততম নওয়াপড়া বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই শঙ্কার কারণ ভৈরব নদ। নদের তলদেশে পলি জমে ভরাট হয়ে আসছে। দুই তীরেই চর জাগতে শুরু করেছে। অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ ও ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা ব্যাপক হারে দখলকে এ ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্যে মূল দায়ী করেছেন স্থানীয় অধিবাসী ও নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ। এছাড়া অব্যাহত দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত ড্রেজিং ও অপরিকল্পিত ঘাট নির্মাণের কারণে থমকে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক স্রোতধারা । অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অচিরেই পায়ে হেঁটে পার হওয়া যাবে নাওয়াপাড়ার ভৈরব নদ। তেমনটি ঘটলে অকার্যকর হয়ে পড়বে নওয়াপাড়া নৌবন্দর। বেকার হয়ে পড়বে হাজার হাজার হ্যান্ডলিং শ্রমিকসহ লাখো মানুষ। পথে বসবে শ শ ব্যবসায়ী। কেবল হ্যান্ডলিং শ্রমিক ও ব্যবসায়ী নয়, পরোক্ষভাবে নদীবন্দরের সঙ্গে যুক্ত মোটরশ্রমিক ও ব্রোকার্স ইউনিয়নের শ্রমিকরাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নদী বন্দর অচল হলে সরকার হারাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। এসব আশঙ্কা থেকে নদ বাঁচাতে কার্যকর ভূূমিকা গ্রহণের দাবি উঠেছে। যদিও বছরের পর বছর ধরে এ দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চললেও অজ্ঞাত কারণে তা মাঝপথে থেমে যায়। পাশাপাশি দখলদারীদের বিরুদ্ধেও অদ্যাবধি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় মানুষ।
সরজমিনে দেখা গেছে, নওয়াপাড়া নৌবন্দরের ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় আধা কিলোমিটার জুড়ে নদীর দুই-তৃতীয়ংশে চর জমে ভরাট হয়ে গেছে। এছাড়াও বন্দরের নওয়াপাড়া জুট মিল সংলগ্ন এলাকা, বেঙ্গল টেক্সটাাইল খেয়াঘাট থেকে নওয়াপাড়া গ্লোবঘাট, তালতলা ঘাটসংলগ্ন এলাকায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদে ছোট -বড় কার্গো জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, ২০২১ সালের ২৪ জুলাই থেকে বিআইডব্লিউটির প্রকৌশল (সংস্কার) বিভাগের আওতায় ভৈরব নদ সংস্কার বা ড্রেজিং শুরু হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ এই ড্রেজিংয়ে বন্দরের তেমন কোনো উপকার হয়নি।
নওয়াপাড়া হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফাল্গুন মন্ডল বলেন, ভৈরব নদ ঘিরে হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়ন, মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ও ব্রোকার ইউনিয়নের ৪০ হাজারের অধিক শ্রমিক ও তাদের পরিবার প্রত্যক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। রয়েছেন নদনির্ভর শ শ ব্যবসায়ী ও তাদের পরিরার। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ এই বন্দরের ক্ষেত্রে বরাবরই চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে।
বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে, অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণের কারণে বেহাল দশায় পড়েছে ভৈরব নদ। তাছাড়া বন্দর এলাকায় ড্রেজিং করে মাটি-বালি ফেলার জায়গা সংকটে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় ব্যাপকহারে চর জাগলেও মাটি-বালি ফেলার জায়গা না পাওয়ায় ড্রেজিং সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নোয়াপাড়া গ্রুপের সেলস্ এন্ড মার্কেটিং হেড মিজানুর রহমান জনি বলেন, নদীর তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে আসছে। দু’তীরেই চর জাগতে শুরু করেছে। শিল্প-বাণিজ্য ও বন্দর নগরীর স্পন্দন ভৈরব নদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। খননটা যদি বন্দরের উপযোগী করে তৈরি করা না হয় তাহলে এ মোকামে ব্যবসা হুমকির মুখে পড়বে।
নওয়াপাড়া সার ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক শাহ মুকিত জিলানী বলেন, এই মোকামে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্য নিয়ে প্রতিদিন ছোট -বড় অনেক জাহাজ আসে। নদে সার, গম, ভুট্টা, সিমেন্ট, ভুষিমাল ও কয়লা নিয়ে জাহাজ নোঙর করে। ড্রেজার আছে। কিন্তু তারা যে কী করে তা সার ব্যবসায়ী সমিতির নলেজে নেই। ঠিকমতো ড্রেজিং না হওয়ায় এই বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে নওয়াপাড়া নদীবন্দরের সহকারী পরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘মূল চ্যানেলে জাহাজ চলাচলে জোয়ারের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় না। আধুনিক নৌবন্দর স্থাপন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এটা বাস্তবায়িত হলে স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধান হবে। নদীর সংলগ্ন এলাকায় ড্রেজিংয়ের মাটি-বালি ফেলার জায়গা সংকটে ড্রেজিং কাজে বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অধিক চর পড়লেও জায়গা সংকটে ড্রেজিং করতে পারছিনা। এক প্রশ্নে এ কর্মকর্তা বলেন, আমরা অভিযান চালিয়ে অনেক ঘাট ইতোমধ্যে দখলমুক্ত করেছি।’