যশোরে আলোচিত ১৫ হত্যাকাণ্ড

0

মীর মঈন হোসেন মুসা ॥ যশোরে খুনখারাবি থামছেই না। আধিপত্য বিস্তার ও পরকীয়া সম্পর্কসহ নানা দ্বন্দ্বের জের ধরে বেশ কয়েকটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে যমজ শিশু সন্তানকে ডোবার পানিতে ডুবিয়ে হত্যা, পরকীয়া সম্পর্কের কারণে ৩ ব্যক্তিকে হত্যা এবং যুবলীগ নেতা উদয় শংকর বিশ্বাসকে গুলি করে হত্যা ও কথিত চরমপন্থি সদস্য জিয়া ফকিরকে বোমা মেরে হত্যাসহ অন্তত ১৫টি হত্যার ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয়।
২০২৩ সালের ২১ মার্চ রাতে কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামে স্ত্রীর পরকীয়ার জেরে খুন হন চা বিক্রেতা মনিরুজ্জামান জিল্লু। স্ত্রী সখিনা খাতুন তাকে পুকুরের পানিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে এবং গায়ের গেঞ্জি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।
গত ৩০ মার্চ রাতে যশোর শহরের বারান্দী নাথপাড়ায় মসজিদের সামনে পূর্ব বিরোধের জের ধরে নাহিদ হোসেন নামে এক কিশোর সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে খুন হন। নাহিদ হোসেন তরফ নওয়াপাড়ার বাসিন্দা। সে ওই সময় বারান্দী নাথপাড়ার মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলো।
একইদিন সন্ধ্যায় ঘুরুলিয়া গ্রামে মেয়েলি ঘটনাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বের জেরে ছোটভাই ইউসুফের ছুরিকাঘাতে খুন হন ইউনুস আলী নামে এক যুবক।
গত ১২ এপ্রিল রাতে সদর উপজেলার আরবপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি গ্রামের বুকভরা বাঁওড়ের পাশে দুবাই প্রবাসী সোহেল রানা নৃশংসভাবে খুন হন। স্ত্রী মিম আক্তার খুশির পরকীয়ার জেরে তাকে গাছি দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মিম আক্তার খুশির প্রেমিক ফারাব্বি তাকে হত্যা করেন। অবশ্য পরে অভিযুক্ত ফারাব্বিকে আটক করতে সক্ষম হয় ডিবি পুলিশ।
গত ২৬ জুন রাতে যশোর শহরের বকচরে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে খুন হন জসিম উদ্দিন নামে একজন মাছ ব্যবসায়ী। আনোয়ারা খাতুন নামে এক নারীর সাথে পরকীয়া সম্পর্কের কারণে খুন হন তিনি। নিহত মাছ ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের বাড়ি মনিরামপুরে। নানা বিষয় দ্বন্দ্বের জের ধরে ৪০ হাজার টাকায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে তাকে প্রেমিকা আনোয়ারা খাতুনই হত্যা করিয়েছেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু হত্যা মিশনে অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তদের আটক করলেও এখনো পর্যন্ত আনোয়ারা খাতুনকে ধরতে পারেনি পুলিশ।
গত ১৭ জুলাই দুপুরে সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাজুয়াডাঙ্গা গ্রামে মনিরামপুর সড়কের পাশের জনৈক সদেব ভদ্রের বাঁশবাগান থেকে অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে গলা কেটে হত্যার চিহ্ন ছিলো। এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় মামলা হলেও এখনো নিহত যুবকের পরিচয় উদ্ধার হয়নি। হত্যায় জড়িত কাউকে আটকও করতে পারেনি পুলিশ।
গত ২৩ আগস্ট রাতে সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের গাইদগাছিতে মাসুদ রানা নামে একজন কাঠ ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের জের ধরে স্থানীয় যুবলীগ কর্মী মুরাদ হোসেনের নেতৃত্বে তাকে হত্যা করা হয়।
গত ২৬ আগস্ট গভীর রাতে বেনাপোলের ছোটআঁচড়া গ্রামে ঘুমন্ত দ্বিতীয় স্ত্রী রেশমা খাতুনকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন আব্দুস সালাম নামে এক ব্যক্তি। পারিবারিক অশান্তির জেরে এই হত্যার ঘটনা ঘটে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের ছোট্ট পোদালিয়া গ্রামে খুন হন যুবলীগ নেতা কামরুজ্জামান কামু। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। নিহত কামরুজ্জামান শংকরপুর ইউনিয়ন শাখা যুবলীগের সদস্য ছিলেন।
১৬ অক্টোবর সকালে মনিরামপুর উপজেলার নেহালপুর ইউনিয়নের পাঁচাকড়ি গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন যুবলীগ নেতা উদয় শংকর বিশ্বাস। তিনি নেহালপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি, পাঁচাকড়ি টেকেরঘাট বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও পাঁচাকড়ি গ্রামের বৈকালী সর্বজনীন পূজা ম-পের সভাপতি ছিলেন। নিহতের মা ছবি রানী বিশ্বাস দায়েরকৃত মামলায় উদয় শংকর বিশ্বাস হত্যার বিষয়ে সম্ভাব্য দুটি কারণ উল্লেখ করেন। এর একটি হলো, পাঁচাকড়ি টেকেরঘাট বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের নির্বাচন ও বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে ৩ জনকে নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং অপরটি হলো, স্থানীয় একটি মাছের ঘেরকে নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব। কিন্তু পুলিশ হত্যায় জড়িত সন্দেহে দুই জনকে আটক করলেও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও আটক করতে পারেনি।
একইদিন যশোর শহরের মুজিব সড়কের পঙ্গু হাসপাতালের পাশে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে খুন হন রিপন হোসেন নামে এক দুবর্ৃৃত্ত। এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় মামলা হলে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। কিন্তু মূল ঘাতক পিচ্চি রাজা ও দেলোয়ার হোসেন দেলোকে এখনো আটক করতে পারেনি পুলিশ।
৩ নভেম্বর রাতে অভয়নগর উপজেলার শুভরাঢ়া ইউনিয়নের রানাগাতী গ্রামে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় জিয়া ফকির নামে এক যুকক খুন হন। তিনি চরমপন্থি দলের সদস্য ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। এ ঘটনায় নিহতের মা হাজেরা বেগম অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে অভয়নগর থানায় মামলা করলে আলোচিত এই হত্যাকা-ে জড়িত কাউকে শনাক্ত ও আটক করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৯ নভেম্বর রাতে যশোর শহরের বড়বাজারের চুড়িপট্টিতে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হয় রাজিম নামে এক কিশোর দোকান কর্মচারী। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে কিশোর সন্ত্রাসীরা।
যশোরে আলোচিত হত্যাকা-ের মধ্যে অন্যতম বেনাপোলের ওমর ফারুক সুমন হত্যা। চোরাচালানের ৩ কোটি টাকার সোনা খোয়া যাওয়ায় বহনকারী ওমর ফারুক সুমনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন সিন্ডিকেটের সদস্যরা। নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং প্লায়ার্স দিয়ে হাতের আঙ্গুল জখম করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার লাশ গুম করতে মাগুরার একটি সড়কের পাশের ঝোপের ভেতর ফেলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে গত ১৬ নভেম্বর লাশটি উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতা ও বেনাপোল পৌরসভার কাউন্সিলর কামাল হোসেনসহ ৯ জনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। তবে সিন্ডিকেটের হোতা এবং হত্যার সাথে জড়িত সোহেলকে এখনো পর্যন্ত আটক করতে পারেনি ডিবি পুলিশ।
গত ২১ নভেম্বর গভীর রাতে কেশবপুর পৌরসভার সাহাপাড়া নতুন মসজিদ এলাকায় ১২ দিন বয়সের দুই যমজ শিশুকে ডোবার পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন তারই গর্ভধারিণী মা সুলতানা খাতুন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের জের ধরে যমজ শিশু সন্তানকে হত্যার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচিত হয়