বাঘারপাড়ার টিআর কাবিটা কাবিখা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ

0

স্টাফ রিপোর্টার (যশোর)॥ যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট খাতে নামমাত্র কাজ করে বা একেবারেই কাজ না করে বরাদ্দের পুরোটাই পকেটে ভরেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। এমনকি অন্য প্রকল্পের শ্রমিকদের ব্যবহার করেও প্রকল্পের সমুদয় টাকা উত্তোলন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ার করেছেন বলে অভিযোগ। ২০২২-২৩ অর্থ বছরের প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে এসব অনিয়ম ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও কাজের বিনিময় খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির আওতায় এসব প্রকল্পের কোথাও নামেমাত্র কাজ হয়েছে। কোথাও কাজ না করেই টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার কিছু প্রকল্প শুধু কাগজেকলমে আছে, বাস্তবে কাজের কোনো প্রমাণ নেই।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে টিআর কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭ শ ৭৯ টাকা, কাবিটা কর্মসূচিতে ৪লাখ ৬৮হাজার ৬৮ টাকা এবং কাবিখা কর্মসূচিতে ৩.৯০ মেট্রিক টন চাল ও ৩.৯০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর মধ্যে এসব প্রকল্পের জন্যে বরাদ্দের পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে প্রকল্পের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ক্ষেত্রপালা এতিমখানা পাকা রাস্তা থেকে লস্কার বাড়ির কবরশালা কাঁচা রাস্তা পর্যন্ত মাটি ভরাটের জন্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা। এখানে কর্মসূচির শ্রমিকদের ব্যবহার করে পাকা রাস্তার কাছে নামমাত্র মাটি দিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হয়েছে। অনিয়মের বিষয়টি এতিমখানার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ক্ষেত্রপালা বড় বাড়ির প্রধান সড়ক থেকে দৌলতপুর প্রাইমারি স্কুল পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে তালের চারা রোপণে বরাদ্দ রাখা হয় ২লাখ ৪৮ হাজার টাকা । এ রাস্তার দুপাশে তালের চারার কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ক্ষেতপালা গ্রামের মিঠু মন্ডল জানান, এখানে কোনো তালের চারা নেই।
দুটি প্রকল্পের সভাপতি ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, রাস্তায় কাজ হয়েছে। তালের চারা লাগানোর সময় না দেখলে পাওয়া যায়? কতগুলো গাছ লাগানো হয়েছে ও গাছের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন সব গাছ তো মরে গেছে ।
পশ্চিমা গ্রামের পরাগের দোকান থেকে মোজাফফার বাড়ি পর্যন্ত কাঁচা রাস্তায় মাটি ভরাটের কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১ লাখ টাকা। এ রাস্তার পাশের মুদি ব্যবসায়ী সোহাগ হোসেন জানান, কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে লবণ ছিটানোর মতো কিছু মাটি প্রথম দিকে দেয়া হয়েছে। পরে আর কাউকে এ রাস্তায় দেখিনি। এ প্রকল্পের সভাপতি ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জাহিদ হাসান। তিনি বলেন, কে বলেছে কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়েছি। আমার এ প্রকল্পে শতভাগ কাজ হয়েছে।
নারিকেলবাড়ীয়া বাজারের সর্বজনীন কালী মন্দির সংস্কার বাবদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে সংস্কারের কোন কিছু দেখা যায়নি। তবে প্রকল্পের সভাপতি দেব কুমার বিশ্বাস জানান, সংস্কারের টাকা হাতে পেয়েছি। সেটা গচ্ছিত আছে। নতুন করে মন্দি নির্মাণ হবে ।তখন এ টাকা ব্যবহার করা হবে।
ক্ষেত্রপালা আনিচুরের বাড়ি থেকে সাধন রায়ের বাড়ি পর্যন্ত কাঁচা রাস্তায় মাটির সংস্কার বাবদ ২ লাখ ২০ হাজার ৬৮ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সাধন রায় জানান, এ রাস্তায় দুইবছর আগে মাটি দেয়া হয়েছিলো। সম্প্রতি কোন মাটি দেয়া হয়নি। এ প্রকল্পের সভাপতি ৬ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামছুর রহমান জানান, আমি কাগজেকলমে প্রকল্পের সভাপতি ছিলাম। চেয়ারম্যানের কথামতো স্বাক্ষর করে দিয়েছি। সব টাকা চেয়ারম্যান তুলে নিয়েছেন। এ কাজের কিছুই আমি জানি না।
নারিকেলবাড়ীয়া নাজির মন্ডলের বাড়ির পাশের রাস্তা থেকে কেরামত সর্দারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় মাটির সংস্কার বাবদ ৩.০৯০ মে.টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। যার সরকারি দর হিসেবে মোট টাকা আসে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫২ টাকা। এ এলাকার আব্দুর রাজ্জাকসহ অনেকেই জানান, কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে নামে মাত্র কিছু মাটি দেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের সভাপতি ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সোহরাব মন্ডল জানান, বেশি কাজ হয়নি। সব মিলিয়ে ৬০ ভাগের মতো কাজ হয়েছে। অন্তারামপুর গ্রামের আজিবারের বাড়ির কাঁচা রাস্তা থেকে মসলেমের বাড়ির কাঁচা রাস্তা মাটি দ্বারা সংস্কারে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩.০৯০ মে টন গম। যার সরকারি দর হিসেবে মোট টাকা আসে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬শ ৮৮ টাকা।
স্থানীয়রা জানান, এখানে কর্মসূচির শ্রমিক দিয়ে সামান্য কিছু মাটি দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য খালেদা সুলতানা জানান, তখন আমি অসুস্থ ছিলাম। শুনেছি মাটি কাটার কথা। পিআইও অফিসে সই করতে গেলে শুনি, আমাকে প্রকল্পের সভাপতি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফিরোজ আহম্মেদ জানান, প্রকল্পের সভাপতিরা কাজ করে ছবি জমা দিয়ে বিল উত্তোলন করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, আমার জানামতে কাজ হয়েছে, কাজ যদি না করে তবে অবশ্যই কাজ করে দিতে হবে।