এক যুগ ধরে অকেজো ৫৩০টি পাটের আঁশ ছড়ানো রিবন রেটিং মেশিন

0

 

আকরামুজ্জামান ॥ পানির অভাবে প্রতিবছরই পাটের আবাদে লোকসান গুণে আসছে যশোরসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চাষিরা। চলতি মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানির অভাবে যশোর জেলায় প্রায় ২৫ শতাংশ চাষিই এখনও পাট কেটে জাগ দিতে পারেননি।
অথচ পাটের আঁশ ছড়ানোর দীর্ঘদিন ধরে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও সেটি আজও পর্যন্ত কাজে আসেনি। বিশেষ করে রিবন রেটিং পদ্ধতির মাধ্যমে আঁশ ছড়ানোর জন্য বিপুল অংকের টাকা ব্যয় করেও সেটি আজও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করতে পারেনি কৃষি বিভাগ। ফলে প্রতিবছর পাট চাষে লোকসানের শিকার হয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন যশোরের চাষিরা।
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী এ বছর যশোর জেলায় ২৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যে ৭৫ শতাংশ জমির পাট কেটে কৃষক জাগ দেয়ার চেষ্টা করছেন। বাকি ২৫ শতাংশ জমির পাট ক্ষেতেই পড়ে আছে। এ অবস্থায় এসব ক্ষেতের পাট কৃষক আদৌ কাটবেন কিনা তা নিয়ে তারা দোটানায় রয়েছেন। ছোটবড় খাল-বিলসহ বিভিন্ন ডোবা ও নালার পানি শুকিয়ে যাওয়ায় প্রান্তিক চাষিরা পাট কাটতে পারছেন না। অনেকেই আবার ভারী বৃষ্টির আশায় পাট কেটে ক্ষেতে ফেলে রেখেছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানান, এ বছর পাট চাষের উপযুক্ত সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ নির্ভর হয়ে পড়েন। যে কারণে তাদের বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এরপর পাট কেটে জাগ দেয়ার উপযুক্ত সময়ে এসে পানির অভাবে তারা পুরোটাই লোকসানের কবলে পড়েছেন।
এদিকে পাটের আঁশ ছড়ানোর জন্য সরকার যশোর জেলায় ৫৩০টি আঁশ ছড়ানো রিবন রেটিং মেশিন দিলেও তা দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে অকেজো অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের সূত্রে জানা গেছে, বিগত ২০১০ সালে সরকার যশোর জেলার আট উপজেলার কৃষকদের জন্য ৮০০টি ও ২০১১ সালে ৭৩০টি পাটের আঁশ ছড়ানোর রিবনার মেশিন সরবরাহ করে। পাটকাঠি থেকে আঁশ ছাড়িয়ে স্বল্প পানিতে তা পচানোর জন্য এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। এজন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ সরকার ৫৬ লাখ টাকা ভর্তুকিও দেয়। তবে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সেটি মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয় করতে তুলতে পারেননি আজও। ফলে এসব রিবন রেটিং মেশিনগুলো এখন উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউনিয়ন পরিষদের কক্ষে পড়ে নষ্ট হচ্ছে।
জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার দক্ষিণ শ্রীরামপুর গ্রামের চাষি আব্দুর রহমান বলেন, প্রতি বছরই তারা পাট চাষ ও কাটার উপযুক্ত সময়ে এসে পানির জন্য বড় ধরনের সঙ্কটে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে এর আগে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আঁশ ছড়ানোর মেশিন দেয়া হলেও তা বেশি দিন টিকেনি। কৃষি বিভাগ থেকে এর চেয়ে আধুনিক যন্ত্র আবিষ্কারের কথা বলা হলেও এই দীর্ঘদিনে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
একই এলাকার চাষি ফুল মিয়া বলেন, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় কোথাও পাট জাগ দেয়ায় মতো পর্যাপ্ত পানি নেই। সেচ দিয়ে পাট জাগ দিতে হচ্ছে। এ বছর পাটের বাজার দর কম হয়ে গেলে আমাদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না। এ অবস্থায় পাট পচানো বিকল্প কোনো পথ থাকলে আমরা বেঁচে যাতাম। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ আগে যে রিবন রেটিং মেশিন আবিষ্কার করেছিলো সে পদ্ধতিও বেশ জটিল ছিলো। তাতে বেশি খরচ হওয়ায় আমরা সহজ পদ্ধতি আবিষ্কারের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কৃষি বিভাগ।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হক বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকরা পাট আবাদ নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়লেও আপাতত বৃষ্টি নামায় আশাবাদী তারা। তিনি বলেন, আমাদের হিসেব মতে জেলার মোট জমির ৭৫ শতাংশ পাট কেটে জাগ দেয়া হয়েছে। বাকি ২৫ শতাংশ জমির পাট কয়েকদিনের মধ্যে কাটা হবে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে কৃষক সঙ্কট থেকে মুক্ত হবে বলে তিনি আশা করেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এর আগে সরকার পাটের আঁশ ছড়ানোর জন্য রিবন রেটিং মেশিন সরবরাহ করেছিলো বটে। তবে সেটি খরচ বেশি হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা গ্রহণ করেন নি। যে কারণে এর বিকল্প সহজ কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যায় কিনা সে বিষয়ে পাট গবেষণা কেন্দ্রের গবেষকরা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।