টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিবন্ধিতা

মো: সাজেদুল ইসলাম
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ জরুরি। এই ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি। ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ, ধরণী সুরক্ষা এবং সব মানুষ যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে শান্তি এবং সমৃদ্ধি অর্জন করে। ২০১৫ সালে বিশ্বের সব দেশ এটি গ্রহণ করেছে। এই সার্বজনীন আহ্বান, কাউকেই পেছনে রাখা যাবে না’ এর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার ভিত্তিক উন্নয়নের জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা আর্থসামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমাজ জীবনে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন তারা। অন্তর্র্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করে। উন্নয়নকে টেকসই করার জন্য আর্থসামাজিক বাধাগুলোকে অতিক্রম করে সবার পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা দরকার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল কথা হচ্ছে, সব জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তকরণ। এই লক্ষ্যমাত্রার ১০ নাম্বারে বৈষম্য হ্রাস করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো, তার নাগরিকদের সঠিক মানবসম্পদ হিসেবে তৈরি করা, আর এই উন্নয়ন যাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ।
প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে সরকার বিশেষ ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, বিনা সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ, স্বাস্থ্য সুবিধাসহ প্রশংসনীয় নানা উদ্যোগ নিলেও এখনো এই ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিবন্ধীদের আর্থিক সম্পৃক্ততা, দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ, যথাযথ কর্মসংস্থান, প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মপরিবেশ ইত্যাদি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আর্থিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তাদের সমাজের মূল ধারায় নিয়ে আসা। দারিদ্র্য ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগগুলোয় ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সমৃদ্ধি প্রত্যাশা করা যায়। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর কাজের জায়গা সীমিত। তাদের এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি সমাজ ও ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সমাজে যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রয়েছে, সেটা কোনোভাবেই একটি মানবিক সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে না। প্রতিবন্ধীদের জন্য যদি তাদের বিশেষ চাহিদাগুলো মাথায় রেখে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া যায়, তাদের কর্মক্ষমতা ও সক্ষমতা প্রচলিত ধারণার সুস্থ শরীরের থেকে কোনোভাবেই কম হবে না। প্রতিবন্ধীবান্ধব ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণ প্রদান ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে বাধাগুলো আছে সেগুলো দূরীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ এর উদ্ধৃতি দিয়ে ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহেবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (বার্ডো) জানায়, আমাদের দেশের প্রায় ৮%-১০% মানুষ কোনো-না-কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। এ জন্য সমাজের মূলধারা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে বঞ্চিত জীবনযাপন করছে। প্রায় এক যুগ হতে চলল, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ অনুস্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাগ্যের তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, ২০১৭ এখনো মানা হচ্ছে না। দেশে এখনো প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতার অভাব সর্বত্র। কারণ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মানছে না কেউ। এ ছাড়া গণপরিবহন ব্যবস্থা এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনের কমিটিগুলো কার্যকর করা হচ্ছে না। প্রতিবন্ধীদের অধিকাংশই দারিদ্র্যের মধ্যে দিন যাপন করে থাকে। প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। ভুল ধারণার কারণে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবন্ধীদের মতামত সাধারণত গ্রাহ্য করা হয় না এবং প্রায়ই তাদের অধিকারগুলো লঙ্ঘন করা হয়, যেটা শেষ পর্ষন্ত তাদেরকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন বার্ডোর মতে, প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান, উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্বরিত সহায়তা এবং তাদের ওপর সব ধরনের হয়রানি রোধের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা খুবই জরুরি। যদি একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়, তবে এটি তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নের সাথে জাতীয় উন্নয়নের একটি যোগসূত্র আছে। যদি প্রতিবন্ধীদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হয়, তাহলে তারা জাতীয় উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতায় প্রভূত অবদান রাখতে পারবে এতে কোনো সন্দেহ নাই। বার্ডো আশা করে যে, আরো বেশি অধিকারভিত্তিক সংগঠন এই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যান্য সংগঠন যারা বর্তমানে উন্নয়ন খাতে কাজ করে, তারাও প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসূচি বা পদক্ষেপ নেবে। জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনে ১৩ ডিসেম্বর, ২০০৬ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক সনদ অনুমোদন করা হয়, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং তাদের সহজাত মর্যাদার প্রতি যথাযথ সম্মানের জন্য গৃহীত হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার সনদটি ৩০ নভেম্বর, ২০০৭ সালে অনুস্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারায় সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। আবার সংবিধানের ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র কখনো ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্য করবে না। একইভাবে, সংবিধানের ২৮(৪) ধারায় সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটা আমাদের প্রত্যাশা যে, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীরা সমাজের মূল ধারায় সম্পৃক্ত হবে এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবার অধিকার সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈষম্যহীন সমাজ গঠিত হবে। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা যায়।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

ভাগ