ভ্যাকসিনের অর্থ জোগাড়ে হিমশিম সরকার : আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন

লোকসমাজ ডেস্ক॥ ভ্যাকসিনের অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। যদিও চলতি বাজেটে এ খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে সরকারের আয়ে ধস নেমেছে। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভ্যাকসিন ক্রয়ের অর্থের জোগান পেতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এ জন্য উন্নয়ন-সহযোগীদের দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। অবশ্য উন্নয়ন-সহযোগীরা আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেবে। এখন পর্যন্ত অবশ্য ১ হাজার কোটি টাকাও আসেনি। তবে প্রতিশ্রুতির বিপুল পরিমাণ অর্থ পাইপলাইনে রয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেশের অন্তত ৪০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হলে কমপক্ষে ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। চলতি বছরের মধ্যেই প্রয়োজন হবে আরও প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এদিকে ভ্যাকসিন ক্রয়, পরিবহন ও প্রয়োগের জন্য ইতিমধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব বিষয় জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৮ জনকে বিনামূল্যে করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) টিকা দেওয়া হবে। ফলে প্রথম দিকে টাকার বিনিময়ে ভ্যাকসিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে ভ্যাকসিন ক্রয়ের সিংহভাগ অর্থই আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন আর সেটি হচ্ছে না। যেহেতু সরকার বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকাই সরকারকে বহন করতে হবে। গত মাসের শেষ দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের নেতৃত্বে ভ্যাকসিনের অর্থায়ন-সংক্রান্ত একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উন্নয়ন-সহযোগী দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় ভ্যাকসিন ক্রয়ে অর্থ সহায়তার যথেষ্ট প্রতিশ্রুতিও এসেছে বলে জানা গেছে। জানা গেছে, বর্তমানে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে প্রস্তুতকৃত যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ‘কভিশিল্ড’ ভ্যাকসিনের ৩ কোটি ডোজ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ টিকা নিয়েছেন। ২৫ লাখের বেশি মানুষ টিকার জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এ ৩ কোটি ডোজ প্রয়োগে ৯ শতাংশ নাগরিক টিকার আওতায় আসবে। এ ছাড়া টিকা ক্রয়ে আরও ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক, যা দিয়ে টিকার আওতায় আসবে দেশের আরও ৩১ শতাংশ মানুষ। বাকি ৪০ শতাংশ তথা ৬ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ নাগরিককে টিকার আওতায় আনতে উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে ৮ হাজার ৯৭১ কোটি থেকে ১৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা দেওয়া হবে বিনামূল্যে। আমরা ইতিমধ্যে এ কার্যক্রম শুরুও করেছি। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের উৎস অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করা যায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎসের পাশাপাশি উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়েছে।’
সূত্র জানায়, ২৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই সভায় আলোচনা হয় যে ইতিমধ্যে জাপান সরকার (জাইকা) ভ্যাকসিন ক্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩০০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার তথা ২ হাজার ৮৪৪ থেকে ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা ঋণ (বাজেট সাপোর্ট), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক গঠিত ‘এশিয়া ভ্যাকসিন এক্সেস ফ্যাসিলিটি’ তহবিল থেকে ভ্যাকসিন ক্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৫০ কোটি টাকা ঋণের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাইকার বাজেট সাপোর্টের আওতায় ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে কিছু অ্যাকশন প্ল্যান চূড়ান্ত করতে হবে। পাশাপাশি অর্থছাড়ের আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে কিছু ‘পলিসি অ্যাকশন’ অর্জন করতে হবে। এ ছাড়া সম্প্রতি এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ৫০০ মিলিয়ন ডলার বা ৫০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এদিকে প্রথমবারের মতো ফ্রেঞ্চ ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (এএফডি) স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সভায় জানানো হয়, আলোচনাধীন উৎসসমূহ থেকে প্রয়োজনীয় ৪০ শতাংশ নাগরিকের জন্য টিকার অর্থ মেটানো সম্ভব। বাজেট সাপোর্টের আওতায় প্রদত্ত সহায়তা সরাসরি অর্থ বিভাগ পাবে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্ধারিত পলিসি আ্যাকশন বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ থেকে প্রয়োজনানুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, প্রতিটি দেশই নিজেদের অবস্থান থেকে চেষ্টা করছে ভ্যাকসিন তৈরি ও তা প্রয়োগের। ইতিমধ্যে অনেক দেশেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। এটি বেশ আশাব্যঞ্জক। অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, ভ্যাকসিন কেনার জন্য নানা দেনদরবারের পর উন্নয়ন-সহযোগীরা ১ বিলিয়ন ডলার বা ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দেবে বলে মোটামুটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাইরে বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এনবিআর ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়তো দিতে পারবে না। কারণ রাজস্ব আদায় কমে গেছে। দেশের সব মানুষের জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হলে সাড়ে ১৬ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কিনতে হবে। এতে মোট ব্যয় হবে আনুমানিক ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রথম দফায় সাড়ে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনার কার্যক্রম চলমান। একই সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচিও চলছে।

ভাগ