গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন আসবে কীভাবে?

লোকসমাজ ডেস্ক॥ আগামী এপ্রিলের মধ্যে করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বাজারে আনতে চায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক ফার্মাসিউটিক্যালস। ব্যানকভিড নামক ভ্যাকসিনটি উৎপাদনের লক্ষ্যে জোরেশোরে কাজ করছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। বর্তমানে এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রস্তুতি চলছে। গ্লোব বায়োটেক দাবি করেছে, এই ভ্যাকসিন যুক্তরাষ্ট্রের মর্ডানা ও ফাইজারের সমকক্ষ হবে। আগামী সপ্তাহে ভ্যাকসিন ট্রায়ালের প্রটোকল বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে (বিএমআরসি) জমা দেয়া হবে। এরপর শুরু হবে প্রথম ধাপের ট্রায়াল। এতে সফল হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল একসঙ্গে সম্পন্ন করা হবে। চূড়ান্তভাবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এ ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেবে।
পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে স্বীকৃতি চাইবে গ্লোব বায়োটেক। জানা গেছে, ট্রায়াল সম্পন্ন করতে প্রাথমিকভাবে আইসিডিডিআর’বিকে দায়িত্ব দিয়েছিল গ্লোব বায়েটেক। কিন্তু স্বনামধন্য এ গবেষণা সংস্থাটিকে বাদ দিয়ে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেড নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা। এই পর্যায়ে এসে গ্লোব বায়েটেকের ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইসিডিডিআরবি’র মতো একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়াকে সন্দেহের চোখে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা ভ্যাকসিনের কার্যকরিতা কোনো ছেলেখেলা নয়। এর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুসরণ করতে হয়। প্রতিটি ধাপে যে ফল আসবে তা অবশ্যই প্রকাশ করতে হয়। এখানে লুকোচুরির সুযোগ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছাড়াও আরো কিছু সংস্থার বিশেষজ্ঞরা এই ফল বিশ্লেষণ করবে। তারা গবেষণা পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে মতামত এবং পরামর্শ দেবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসরণ ঠিকমতো হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার পর ভ্যাকসিনের বৈধতা ও অনুমোদন দেয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময় সাপেক্ষ এবং এর জন্য বহু বিষয়ে সক্ষমতার দরকার। গ্লোব বায়েটেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে তার সক্ষমতা বিশেষজ্ঞদের অজানা। এ বিষয়ে গ্লোব বায়োটেকের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি অপারেশন বিভাগের ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, সিআরও প্রতিষ্ঠানের তথ্য বাইরে প্রকাশে ওষুধ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা আছে। তবে তারা যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন সেটি ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে যথেষ্ট সক্ষম বলে দাবি করেন মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, গ্লোবের ভ্যাকসিন তৈরিতে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর তত্ত্বাবধান থাকবে। এর সঙ্গে বিএমআরসি ও ওষুধ প্রশাসনও যুক্ত থাকবে। তাই ভ্যাকসিন তৈরি প্রক্রিয়াটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। সরকারের সহযোগিতা পেলে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ভ্যাকসিন বাজারে আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য মোট ৮টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল, ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়াহরিয়াল ডিসিজ এন্ড রিচার্স বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি), ফাইলেরিয়া এন্ড জেনারেল হসপিটাল, বেক্সিমকো বায়ো ইকুইভ্যালেন্স সেন্টার, প্রজন্ম রিসার্চ ফাউন্ডেশন, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট এবং ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স এন্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস। গ্লোব বায়োটেক তাদের ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের জন্য গত ১৪ই অক্টোবর আইসিডিডিআরবি’র সঙ্গে চুক্তি করেছিল। কিন্তু চুক্তির দেড় মাস পরও কাজ শুরু না করায় তা বাতিল করে গ্লোব। এ নিয়ে আইসিডিডিআর’বি-এর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পরে ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য চুক্তি করে গ্লোব। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালে ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন পায়। ফারাবি জেনারেল হাসপাতাল এর ক্লিনিক্যাল সাইট। ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেডের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াও এ প্রতিষ্ঠানটি কিউবা সরকারের ওষুধ প্রশাসন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিরীক্ষিত। এছাড়া কানাডা ও ফ্রান্সের কিছু সংস্থা তাদের ওপর নিরীক্ষা চালিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দু’টি ক্লিনিক্যাল সাইট রয়েছে। এছাড়া বায়োকেমিস্ট্রি ও হেমাটোলজি ল্যাব সুবিধা রয়েছে তাদের। তবে ওয়েবসাইটের কোথাও তাদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কাজের প্রমাণ মেলেনি। ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেডের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য আইসিডিডিআরবি’র সমকক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান আছে বলে তার জানা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য যে যোগ্যতার কথা বলেছে আইসিডিডিআরবি তা পূরণ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামও গ্লোব বায়োটেকের নিয়োগকৃত সিআরও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বিষয়ে অবগত নন। তার মতে, ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবিই বাংলাদেশে সেরা। এর গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের। তারা বহু রোগের ভ্যাকসিন প্রস্তুত করে তাদের কাজের প্রমাণ দিয়েছে। এর গবেষণা দলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বহু গবেষক রয়েছে। সিআরও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ক্লিনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন লিমিটেডের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই তারা কাজ করছেন। সুতরাং তাদের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। এর আগে অনেক ওষুধ প্রস্তুতে তারা প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে ট্রায়াল সম্পন্ন করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনের পর তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করবেন।

ভাগ