বাজেট বাস্তবায়ন : সদিচ্ছার সাথে চাই কারিগরি জ্ঞান

প্রফেসর ড. এম এ মান্নান
বাজেট প্রণয়ন রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রতি বছর জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ ও পাস হয়। বাজেট পেশ হওয়ার আগে আমরা এক ধরনের মূল্যায়ন করি। বাজেট কেমন হওয়া উচিত, কোন খাতে জোর দেয়া উচিত, কোন খাত উপেক্ষিত থাকলে অর্থনীতির গতি ব্যাহত হবে ইত্যাদি নিয়ে কথা বলি। বাজেট উপস্থাপনের পর আমাদের সমালোচনার ধারাও পরিবর্তিত হয়। তখন বাজেট কেমন হয়েছে সেই বিশ্লেষণের দিকে সবার মনোযোগ থাকে। প্রস্তাবিত বাজেটের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আলোচনায় উঠে আসে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার তাদের বিশ্লেষণ গ্রহণ করে প্রস্তাবিত বাজেটের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করবে। কিন্তু পাস হয়ে গেলে বিশ্লেষকদের আলোচনায় বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তবে আমাদের দেশের সমস্যা হলো, এখানে সরকার যাই বলুক না কেন বিরোধী দলের কাছে তা সমালোচনার যোগ্য। আবার বিরোধী দল যাই বলুক না কেন তা সরকারের কাছে গুরুত্বহীন। এ অবস্থা আমাদের জাতীয় অগ্রগতি ব্যাহত করছে। অর্থনীতির একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে বাজেটের ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই আমার কিছুটা আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু ৩৩ বছর বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফেরার পর গত দুই যুগের বেশি সময় একই চিত্র দেখতে দেখতে বলতে গেলে হাঁপিয়ে উঠেছি। এবার বাজেট পেশের সময়টি স্বাভাবিক ছিল না বা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। বাজেট পেশকালে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, অস্বাভাবিক সময়ের বাজেট। হ্যাঁ, এটা ঠিক। কিন্তু অস্বাভাবিক সময়ের বাজেটও যে অস্বাভাবিক বা প্রচলিত ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কিছু করার দরকার ছিল। অর্থাৎ অস্বাভাবিক সময়ও আমাদের নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প পথে চিন্তা করতে শেখাতে পারেনি।
বাজেটে প্রধানত দু’টি অংশ থাকে- ইনটেলেকচুয়াল পার্ট ও অপারেশনাল পার্ট। প্রথমটি বাজেট প্রণয়ন আর দ্বিতীয়টি বাস্তবায়নের সাথে জড়িত। বাজেট পাস হওয়ার পর এর বাস্তবায়নের প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। আমি বহু দিন ধরে বলে আসছি, আমাদের বাজেট হওয়া দরকার ছিল ত্রিমুখী বা তিনটি খাতের জন্য আলাদা বাজেট। এই তিনটি খাত হলো : কর্পোরেট সেক্টর বা আনুষ্ঠানিক খাত, নন-করপোরেট সেক্টর বা অনানুষ্ঠানিক খাত এবং ভলান্টারি সেক্টর বা স্বেচ্ছাসেবক খাত। কর্পোরেট সেক্টরের প্রতি সরকারকে নজর দিতে হবে। কারণ এটা আনুষ্ঠানিক এবং দেশের শিল্প-কারখানা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক ভিত্তি এই খাত। ব্যাংকিং এই খাতের অংশ হলেও একে আমি কখনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিনি, সবসময় সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছি। আমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির নামের সাথে সোস্যাল শব্দটা রয়েছে এ কারণেই। বর্তমান করোনাভাইরাস সঙ্কটের সময় এই করপোরেট খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হলো, এতে কর্মসংস্থানের কী ক্ষতি হলো তার ভিত্তিতে এই খাতের সংস্কার করা জরুরি। সরকারি প্রণোদনা প্রদান বা কর মওকুফের মতো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কারণ কর মওকুফ বা অন্যান্য ব্যবস্থা না হলে আমাদের কতজন মানুষ, কতটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই হিসাব করতে হবে।
নতুন বাজেট ঘোষণার পর আমরা শুধু কোন পণ্যের দাম কমবে আর কোনটার বাড়বে সেই হিসাব করি। কিন্তু কেউ যে আলোচনাটি করে না সেটি হলো, বাজেটে পরোক্ষ কর কিভাবে আরোপ করা হচ্ছে। আমরা সরকারকে শিল্পের ওপর কর ধার্য করতে দেখি। কিন্তু শিল্প তো কর দেয় না, সেটি দেয় ভোক্তা- দিনমজুর, রিকশাওয়ালারা। গরিব মানুষ যে লবণ খায় তাকেই সেই লবণের জন্য কর দিতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে আমরা দেখি সরকার লবণ কারখানার ওপর কর বসাচ্ছে। ওই কারখানা কিন্তু গরিবের কাছ থেকেই করের পয়সাটি আদায় করে নিচ্ছে। এটা সাধারণ মানুষের বোধগম্য হয় না। আসলে করপোরেট সেক্টরে কর বসানো এক ধরনের প্রহসন। করপোরেট সেক্টরে কর বসানো হলে প্রকারান্তরে সেই কর দিনমজুরের ওপরেই বসছে। তাই এই খাতের কর ব্যবস্থাপনাটি এমন হওয়া উচিত যাতে গরিবের ওপর বোঝা না চাপে। একে আমি করপোরেট খাতের হিউম্যানাইজ বা মানবিকীকরণ বলছি। কিন্তু আমরা নন-করপোরেট বা অনানুষ্ঠানিক যে খাতটির কথা বলি বাজেটে গড়পড়তায় এর প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকলেও এর প্রতি পর্যাপ্ত নজর দেয়া হয় না বা এই খাতের সমস্যাগুলো নিরসনের যথার্থ চেষ্টা চলে না। বহুল প্রচলিত একটি শব্দ দারিদ্র্য বিমোচন। এটা একটি বহুল আলোচিত বিষয়। বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে সবার মুখে এই বুলি। নানা পরিভাষাও ব্যবহার করা হয় : দারিদ্র্য বিমোচনা, দারিদ্র্য হ্রাস, কাঠামোগত সমন্বয়, আরো অনেক কিছু। আসলে সবকিছুর মূল সুর একই। আমাদের শ্রমিকদের ৭০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। ফলে আমরা যখন বলছি, আমরা দারিদ্র্যবিমোচন করছি তখন বাজেটে বিশ্লেষণটাও থাকা দরকার। বাজেটে এ খাতের ওপর কোনো ফোকাস থাকে না। এর কারণও রয়েছে। এই খাতের সঠিক মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের প্রচেষ্টা আমাদের পাঠ্যক্রমেই অনুপস্থিত। আমরা কি কখনো রিকশাচালকের অর্থনীতি আমাদের পাঠ্যবইয়ে স্থান দিয়েছি? দিনমজুর, কৃষকের অর্থনীতি নিয়ে আমরা কতটা গবেষণা করেছি? আমরা তাদের একটি সর্বজনীন দৃষ্টিতে দেখি।
এদের আমরা এক কথায় বলি খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু এই খেটে খাওয়া মানুষদের মধ্যেও যে বিভাজনটি রয়েছে সেটি আমরা কখনো হিসাব করি না। করোনাভাইরাস একজন রিকশাচালককে যেভাবে কর্মহীন করেছে সেখাবে কোনো প্রান্তিক চাষিকে কর্মহীন করেনি। অথচ অর্থনীতির দৃষ্টিতে দু’জনই খেটে খাওয়া মানুষ। অবশ্য তাদের মধ্যেও পার্থক্য আছে। কিন্তু এভাবে শ্রমভিত্তিক বিভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলোর ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা, সমস্যা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত কে সংগ্রহ করবে, কে বিশ্লেষণ করবে? এটা সরকারের কাজ। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিসংখ্যান বিভাগের কাজ। এ কাজ সম্পাদন এক দিনে সম্ভব নয়। কিন্তু করাতো দরকার। এই প্রতিটি গ্রুপের কনজাম্পশন ফাংশন বা ভোগের ধরন বা বিভাজনটি কী রকম তা দেখতে হবে। এর মানে একজন মানুষ তার আয়ের কত অংশ খাবার কেনায়, কত অংশ আবাসনে, কত অংশ ওষুধে, কত অংশ পোশাকে, কত অংশ সন্তানের শিক্ষার পেছনে, কত অংশ বিনোদনে, কত অংশ অন্যান্য খাতে খরচ করে সে বিষয়টি দেখা। হতদরিদ্র মানুষের প্রতিটি গ্রুপের কনজাম্পশন ফাংশন বের করতে হবে। তাহলেই তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের পথ প্রশস্ত হবে। বাজেটে এই বিশ্লেষণ থাকলে বোঝা যাবে এদের ওপর সরকারের করের বোঝা কতটুকু চাপে। ধনিরা কর দেয় নামকাওয়াস্তে। বাজেটের ৭০-৮০ শতাংশ কর দেয় এই গরিবরা, এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো। তাই আমি এই খাতের এমপাওয়ারমেন্ট বা ক্ষমতায়নের কথা বলছি। এবার আসি স্বেচ্ছাসেবক খাতের প্রসঙ্গে। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, আমাদের বাজেটে বরাবরাই এই খাতটি উপেক্ষিত। আমি বহু বছর ধরে এ ব্যাপারে কথা বলে আসছি। বর্তমান অর্থমন্ত্রী যখন এ পদে ছিলেন না তখন আমার সাথে কয়েকটি অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎ হয়েছিল। ইসলামিক ব্যাংকগুলোর যে ফোরাম সেটি প্রতি বছর একটি সেমিনারের আয়োজন করে। তিনি সেখানে আসতেন। তখন আমি দেখেছি যে ইসলামিক অর্থনীতির ওপর অর্থমন্ত্রীর আগ্রহ রয়েছে। এর পরও বাজেটে বিশেষ করে ইসলামের স্বেচ্ছাসেবক খাতগুলো সম্পর্কে কোনো বক্তব্য না থাকা আমাকে অবাক করে। মাহাথির মোহাম্মদ কেন এখনো সে দেশে এত জনপ্রিয়? কেন প্রায় দুই যুগ ক্ষমতায় থাকার পর বিদায় নিয়ে আবারো নব্বই বছরের বেশি বয়সে ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছিলেন? তিনি প্রথমবারের মতো একজন নারী জেতি আখতার আজিকে মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক- ব্যাংক নেগারার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তার সাথে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি ইসলামিক সেন্টার অব এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করেন, যে প্রতিষ্ঠান শুধু ওয়াক্ফ নিয়ে কাজ করবে। তার লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে অলস পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ তহবিল নিয়ে আসা, যার পরিমাণ তখনই ছিল দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। আমাদের দেশে সব ইসলামিক ব্যাংকের মিলিয়ে ৬০০-৭০০ শাখা আছে। এদের যদি ইসলামিক স্বোচ্ছাসেবক খাতের সম্পদ কাজে লাগানোর ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া যেত তাহলে এই সম্পদ কাজে লাগানো যেত। যাই বলি না কেন, আমাদের দেশে তৃণমূলপর্যায়ে এখনো ইসলাম বেঁচে আছে। এখানে সাধারণ মানুষও জাকাত, সদকাহ, দান- এ কথাগুলো বোঝে। আমাদের দেশের মসজিদগুলো শত শত বছর ধরে চলছে মানুষের দান, অনুদান, সহায়তার অর্থে। আমাদের স্বেচ্ছাসেবক খাতটি ছিল সোনার খনির মতো। এই খনিটিকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। আমি এই খাতের মনিটাইজ বা আর্থিকীকরণের কথা বলছি। কিভাবে এটা করা যাবে? আমাদের যে বিশাল ওয়াক্ফ সম্পদ রয়েছে সেগুলোর উন্নয়নে আমরা ওয়াক্ফ ডেভলপমেন্ট বন্ড ছাড়তে পারি। আমি এরকম আটটি বন্ড তৈরি করেছিলাম। আমার ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব উল্লেখ রয়েছে। মস্ক ডেভেলপমেন্ট, ওয়াক্ফ ডেভেলপমেন্ট, ক্যাশওয়াক্ফ সার্টিফিকেটসহ আটটি এরকম বন্ড ও সার্টিফিকেট রয়েছে। এভাবে আমাদের ওয়াক্ফ সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে কাজে লাগানো গেলে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণেও বৈদেশিক সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয় না। যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতকে বলে থ্রাস্ট সেক্টর। সেখানকার অর্থনীতিতে এই খাতের অবদান বিপুল। দেশটির মোট জিএনপি’র ১০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। আমরা তাদের বাজেট অনুকরণ করি; কিন্তু সেটি আত্তীকরণ করতে পারিনি। অর্থাৎ তাদের বাজেটকে আত্মস্থ করে আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেটা সাজাতে পারিনি। অনুকরণ করা এক কথা আর আত্তীকরণ করা আরেক কথা। উপরোক্ত প্রতিটি খাতের সাথে মানুষের ও সমাজের কি সম্পর্ক তা কোনো বাজেটেই তুলে ধরা হয় না। বাজেট শুধু যোগ-বিয়োগের হিসাব। বাজেটে কোনো খাতে কর বাড়ানো আর কোনো খাতে কমানো হয় মাত্র।
আমাদের এখানে বাজেট করে অ্যাডমিনিস্টার। কিন্তু এর চূড়ান্ত ফলাফল বা ইমপ্লিকেশন কী হবে সেই ব্যাখ্যা করার মতো কোনো ব্যবস্থা থাকে না। আমাদের এখানে বাজেট প্রণয়নে যেমন দক্ষতার অভাব দেখা যায় তেমনি রাজনৈতিক সদিচ্ছারও ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও ধনীদের চাটুকারিতার কারণে আমাদের অর্থনীতি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আমরা সব সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা বলি। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই হবে না। এই সদিচ্ছার সঙ্গে গভীর কারিগরি জ্ঞানেরও সংযোগ থাকতে হবে। সেই জ্ঞান চাটুকারের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। রাজনৈতিক নিয়োগ দিয়েও হবে না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করতে হবে। অর্থমন্ত্রী না হয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেন; কিন্তু গভর্নরকে তো রাজনৈতিক ব্যক্তি হলে চলে না। দুঃখের বিষয় আমাদের এখানে প্রায় সব সরকারই গভর্নরকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাছাই করেছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। কারিগরি বিষয়ে রাজনীতি টেনে আনলে দেশের উন্নতি হবে কিভাবে? প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন থাকবে সৎ, যোগ্য লোক নিয়ে আসুন, দেখবেন উন্নয়নের গতি অনেক বেড়ে গেছে।
লেখক : ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সাবেক অর্থনৈতিক পরামর্শক, অর্থনীতির অধ্যাপক, কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক কর্মকর্তা
ভাগ