হিমালয় কন্যা নেপালে করোনাযুদ্ধ

0
আমিরুল আলম খান
হিমালয় কন্যা নেপালের সুনাম বিশ^জুড়ে। পর্যটনের স্বর্গ হিসেবে খ্যাতি তার। সার্কভুক্ত দেশ। কাঞ্চনজঙ্ঘা, ধবলগিরির অপরূপ রূপসুধা পান করতে তামাম দুনিয়ার মানুষ ছুটে আসে নেপালে। এই ঘন করোনাকালে কেমন আছে হিমালয় দূহিতা? প্রধমেই বলে রাখি এ পর্যন্ত করোনায় মরার কোন দুঃসংবাদ আসে নি নেপাল থেকে। আর আক্রান্ত হয়েছে মাত্র ৪৫ জন। এ সংখ্যা প্রতি ১০ লাখ জনের হিসেবে মাত্র ২ জন। এর মধ্যে ৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন, বাকি ৩৮ জনের অবস্থা মোটেই ঝুঁকিপূর্ণ নয়। এ পর্যন্ত নেপাল পরীক্ষা করেছে ৮,৭৭৩ জনকে আর তাতে প্রতি ১০ লাখের হিসেবে ৩০১ জন।
এ খবর আমাদের মিডিয়া প্রকাশে আগ্রহী নয়। তাদের কারবার আতংক ছড়ায় এমন সব খবর নিয়ে। গোটা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র যা পাওে নি নেপাল তা পারল কী করে? বিশেষ কওে এমন একটা পর্যটন অর্থনীতির দেশ হয়ে। সে ম্যাজিক নিয়ে মিডিয়া টুঁ শব্দ কাঁড়ছে না। আমরা এবার নেপালের সেই বিজয়গাথা শুনব। ঊলার অপেক্ষা রাখে না নেপাল খুব গরিব দেশ। পাহাড়ের উপর, স্থলবেষ্টিত হওয়ায় তাকে পুরোপুরি ভারতের উপর নির্ভর করতে হয়। নেপালের গোর্খা সেনাদেও সুখ্যাতি ছিল, আজও আছে। এখন সেখানে চীনপন্থী কম্যুনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় । কিন্তু নেপালকে ভারত কবজা কওে রেখেছিল বহু বছর ধরে। সে ইতিহাস থাক। তবে এটুকু বলতেই হবে, চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম চেষ্টা ভারত রুখে দিয়েছিল তার সীমান্ত বন্ধ কওে দিয়ে। ভারতীয়দেও নেপাল যেতে পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই দরকার হয় না। শুধু ভারতীয় নাগরিত পরিচয়পত্র হলেও সে দেশে যেতে পারে। নেপালের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ভারতীয়রাই। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র বহাল ছিল ২০০৮ পর্যন্ত। প্রবল গণআন্দোলনের মাধ্যমে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। বর্তমান শাসনতন্ত্র কার্যকর হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এই সংবিধান প্রণয়ন ও তা কার্যকর করতে ভারত সাধ্যমত বাঁধার সৃষ্টি করেছিল।
আয়তনে নেপাল প্রায় বাংলাদেশের সমান, ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ১৮১ বর্গকিলোমিটার। চাষযোগ্য সমভূমি অল্পই। মোট জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৮১ লক্ষ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনবসতি ১৮০ জন। শিক্ষিতের হার ৫৯.৬৩ শতাংশ। মাথাপিছু বার্ষিক আয় (পিপিপি হিসেবে) ৩,৩১৮ মার্কিন ডলার। বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক সিদ্ধার্থের জন্মভূমি নেপালে এখন হিন্দু জনসংখ্যা ৮১.৩ শতাংশ, বৌদ্ধ ৯ শতাংশ। বাকি অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এবার নেপালে করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ২৪ জানুয়ারি, রাজধানী কাঠমান্ডুতে। তার সংক্রমণ ছিল মৃদু এবং তাকে নিজ বাড়িতে ঘনবন্দি থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। পওে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হন। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত নেপালের কম্যুনিস্ট সরকার করোনা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, চিকিৎসা সামগ্রী, ওষুধপত্র, স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়ানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিবিড় ট্রেনিং দেবার পাশাপাশি জনসচেতন বাড়াতে সর্বাত্মক প্রয়াস গ্রহণ করে। দি¦তীয় রোগী পাওয়া যায় ২৩ মার্চ। পরদিন ২৪ মার্চ সারা দেশ লকডাউন করা হয়। ৪ থেকে ১১ এপ্রিলে পযন্ত আক্রন্ত হয় ৯ জন। ১৬ এপ্রিলে হঠাৎ করে বেড়ে ১৬ জনে, ২১ এপ্রিল সে সংখ্যা পৌঁছে ৪২ জনে। আজ ২২ এপ্রিল আরও ৩ জন আক্রান্ত হয়েছে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি নেপাল তাদের সকল সীমান্তে এবং বিমান বন্দরে কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করে এবং দু’দিন পরই ভারত ও চীনের সাথে সকল স্থল সীমান্ত সিল করে দেয়, বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়। সকল পরীক্ষা স্থগিত করে স্কুল কলেজ বিশ^বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করে। দ্রুত সারা দেশে করোনা পরীক্ষার জন্য ল্যাব স্থাপন ও স্বাস্থ্য পরিষেবা জোরদার করে। পর্যটন উন্নয়নের লক্ষে ঘোষিত ‘ভিজিট নেপাল বর্ষ ২০২০’ বাতিল করে দেয়। দ্রুত স্বাস্থ্যকর্মী স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। করোনা মোকাবেলায় নেপাল দ্রুত দেশটি লকডাউন করার ফলে অর্থনীততে ধ্বস নামে। হাজার হাজার দিন মুজুর কাজ হারায়। তবু জীবন বাঁচাতে তারা বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুসরণে সামান্য দ্বিধা বা দেরী করে নি। ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন জারি থাকবে এবং ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সকল বিমান চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে। ভারতে কর্মরত কয়েক হাজার কর্মজীবি পায়ে হেঁটে বাড়ি যাবার চেষ্টা করে। পর্বতসংকুল নেপালে সে এক কঠিন কাজ। এমন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট সকল লোকজনকে বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দেয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান গ্রহণ করে সরকার।  করোনা দমনে নেপাল অসীম সাহসিকতার সাথে লড়ে যাচ্ছে। আর এর ফলেই সেখানে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত্র একজনেরও প্রাণহানী ঘটে নি নেপালে। তবে সারা দৃনিয়ার মত নেপালেও করোনার মারাত্মক প্রভাব পড়বে। অনেক কিছুই ভেঙে পড়বে। বদলে যাবে জীবনযাত্রার চিরপরিচিত ধরন।
আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডেও সাবেক চেয়ারম্যান