“যশোরে পুলিশের ভুলে নির্দোষ ব্যক্তিদের কারাভোগ মানবাধিকার লঙ্ঘন”

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ওয়ারেন্টের প্রকৃত আসামির পরিবর্তে যশোরে সবুজ, রেখা, আজিজের পর এবার দিনমজুর মিজানকে পুলিশের হাতে আটক হয়ে বিনাদোষে কারাভোগ করতে হয়েছে। কেউ একদিন আবার কেউ ৩ মাস পর্যন্ত বিনাদোষে কারাভোগ করেছেন। তবে শুধুমাত্র সাংবাদিকদের তৎপরতা ও সংবাদপত্রের ভূমিকার কারণে নিরাপরাধ এইসব মানুষ রক্ষা পাচ্ছেন বারবার। কিন্তু ওয়ারেন্টের আসামি আটকে যথাযথ খোঁজখবর না নিয়ে পুলিশ একজনের পরিবর্তে আরেকজনকে ধরে এভাবে আর কত দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিবে তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। যশোরের সিনিয়র আইনজীবীরা পুলিশের এই ‘ভুলকে’ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করছেন, দায়িত্বে গাফিলতি এবং ওয়ারেন্ট তামিলে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের খুশি রাখার জন্য বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। অপরদিকে রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয়কৃষ্ণ মল্লিক মানবিধকার রক্ষায় ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন। ক্ষতিপূরণে আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে দৈনিক লোকসমাজকে জানিয়েছেন।
যশোরে ২০১৯ সালের মার্চে প্রথম আলোচনায় আসে পুলিশের ‘ভুলে’ রেখা নামে নারী আটকের ঘটনা। ১৯ মার্চ কোতয়ালি থানা পুলিশের তৎকালীন এসআই আমিরুজ্জামান তাকে আটক করে মাদক সংক্রান্ত মামলার সাজাপ্রাপ্ত ওয়ারেন্টের আসামি শিরিন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করেছিলেন। প্রকৃত আসামি শিরিন বেগম চাঁচড়া রায়পাড়া ইসমাইল কলোনির শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। বর্তমানে তিনি বিদেশে রয়েছেন। অপরদিকে রেখা ঝিনাইদহ শহরের শহীদ মশিউর রহমান সড়কের বাসিন্দা লাল্টু শেখের মেয়ে এবং শহিদুল ইসলাম নামে ওই ব্যক্তির সাবেক দ্বিতীয় স্ত্রী। আটকের পর রেখা তিনি শিরিন নন বললেও পুলিশ তার কথায় পাত্তা না দিয়ে এবং এ বিষয়ে খোঁজখবর না নিয়ে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। তবে আটক রেখা ‘শিরিন’ নয় দাবি করে ২৪ মার্চ আদালতে আবেদন করেন তার আইনজীবী। পরে আদালত পুলিশকে এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন। আদালতের ওই আদেশের তদন্ত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গোলাম রব্বানী। তদন্তে তিনি রেখার দাবির সত্যতা খুঁজে পান। ফলে পুলিশের ভুল স্বীকার করে দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ৪ এপ্রিল আদালত নির্দোষ রেখাকে মুক্তির আদেশ দেন।
উল্লেখ্য, বিষয়টি প্রথমে জানতে পারেন সাংবাদিকেরা। এ নিয়ে সেই সময় পত্রপত্রিকায় ধারাবাহিক কয়েকটি সংবাদ প্রকাশ হলে টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। ফলে পুলিশের ভুল স্বীকার করে দেয়া প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত থেকে মুক্তি পান নিরাপরাধ রেখা। এরপর শুধুমাত্র পিতার নামে মিল থাকায় মামলার ওয়ারেন্টে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে সবুজ বিশ্বাস নামে একজন ট্রাকচালককে পুুলিশ আটক করে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। সবুজ বিশ্বাস খোলাডাঙ্গার খায়রুল বিশ্বাসের ছেলে। ২০০৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলার বেড়বাড়ি গ্রামে মিঠু শেখ নামে এক যুবক খুন হয়েছিলেন। এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি খোলাডাঙ্গা গ্রামের খায়রুল ইসলামের ছেলে জনি। দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় আদালত থেকে জনির বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হয়। এরপর ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কোতয়ালি থানা পুলিশের এএসআই সোহেল রানা ওয়ারেন্টের প্রকৃত আসামির পরিবর্তে শুধুমাত্র পিতার নামের সাথে মিল থাকায় সবুজকে আটক করে ‘জনি’ হিসেবে আদালতে সোপর্দ করেন। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বিষয়টি পরে সাংবাদিকরা জানার পর পত্রপত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ পায়। ফলে টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। আটক করা হয় ওয়ারেন্টের প্রকৃত আসামি জনিকে। এরপর ভুল স্বীকার করে পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আটকের ৩ মাস পর ২২ মে আদালত নির্দোষ সবুজ বিশ্বাসকে মুক্তির আদেশ দেন।
একই বছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালে যশোরের চৌগাছা থানার পুলিশ নিরাপরাধ কৃষক আব্দুল আজিজ দফাদারকে আটক করে একটি ডাকাতি মামলার ওয়ারেন্টের প্রকৃত আসামি আব্দুল আজিজ হিসেবে কারাগারে পাঠিয়েছিলো। ৯ ডিসেম্বর তাকে আটক করেন থানা পুলিশের এএসাই আজাদ। কৃষক আব্দুল আজিজ দফাদার সিংহঝুলি গ্রামের মৃত আহাদ আলী দফাদারের ছেলে। অপরদিকে প্রকৃত আসামি আব্দুল আজিজের বাড়িও সিংহঝুলি গ্রামে। তার পিতার নাম আহাদ আলী দফাদার। নিরাপরাধ কৃষক আব্দুল আজিজ দফাদারকে আটকের বিষয়টি পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলে টনক নড়ে পুলিশ প্রশাসনের। এরপর পুলিশের ভুল স্বীকার করে দেয়া প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নিরাপরাধ আব্দুল আজিজকে মুক্তির আদেশ দেন। ৯ দিন কারাভোগের পর ১৮ ডিসেম্বর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সর্বশেষ চলতি ২০ জানুয়ারি যশোর কোতয়ালি থানা পুলিশের হাতে আটক বিনাদোষে একদিন থানার হাজতবাস এবং একদিন কারাভোগ করতে হয়েছে খোলাডাঙ্গা সরদারপাড়া আরবপুরপাড়ার দিনমজুর মিজানুর রহমানকে। জিআর-৭৯/১৫ ওই মামলার ওয়ারেন্টের প্রকৃত আসামির নামও মিজানুর রহমান। প্রকৃত আসামি মিজানুর রহমান সুজলপুর হঠাৎপাড়ার মৃত নুরুল হাওলাদারের ছেলে। অপরদিকে দিনমজুর মিজানুর রহমানের পিতার নাম মৃত নুরুল ইসলাম। আটকের সময় দিনমজুর মিজানুর রহমান কোতয়ালি থানা পুলিশের এএসআই আল মিরাজ খানকে বারবার তার আইডি কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার কথায় পাত্তা দেননি পুলিশের ওই কর্মকর্তা। পরদিন দিনমজুর মিজানুর রহমানকে ওয়ারেন্টের আসামি মিজানুর রহমান বানিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এ নিয়ে ২২ জানুয়ারি পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলে টনক নড়ে পুলিশের। পরে পুলিশ ভুল স্বীকার করে প্রতিবেদন দিলে আদালত মুক্তির আদেশ দেন নির্দোষ মিজানুর রহমানকে।
এদিকে পুলিশের এ ধরনের কর্মকান্ডকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম এ গফুর বলেন, পুলিশের এ ধরনের কর্মকান্ড চরম দায়িত্বহীনতার শামিল। ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে ক্ষতিপুরণ চেয়ে আদালতে মামলা করতে পারেন। তাছাড়া এ বিষয়ে তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এগিয়ে আহবান জানান। দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রকিউসিটর সিনিয়র আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুলিশের দায়িত্ব খোঁজখবর নিয়ে মামলার ওয়ারেন্টে প্রকৃত আসামি আটকের। কিন্তু ওয়ান্টের আসামি আটকের নামে পুলিশ নির্দোষ ব্যক্তিকে আটক করে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের খুশি করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। অপরদিকে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয়কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, পুুলিশ অসত্য ও অসততার আশ্রয় নিচ্ছে। তারা এ কারণে ভুক্তভোগীদের মানবাধিকার রক্ষায় আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে যাওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নিবেন।