লোকসমাজ ডেস্ক ॥ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে তাবিথ আউয়ালকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। এছাড়া দক্ষিণে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছেন ইশরাক হোসেন। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে মেয়র পদে দুই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টায় বিএনপির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে মেয়র পদে তিন মনোনয়নপ্রত্যাশীর সাক্ষাৎ নেন তারা। এ সময় লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্কাইপে যুক্ত হয়ে দুই প্রার্থীকে পরামর্শ দেন।
মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমিরউদ্দীন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মির্জা আব্বাস, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. আব্দুল মঈন খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও সেলিমা রহমান উপস্থিত ছিলেন। গত শুক্রবার ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির তিন নেতা। তারা হলেন আসাদুজ্জামান রিপন, তাবিথ আওয়াল ও ইশরাক হোসেন। এদিন বিকেল ৪টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা উত্তরে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী তাবিথ আওয়াল এবং ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী ইশরাক হোসেন একসঙ্গে আসেন।
প্রথমে তাবিথ আওয়াল এবং পরে ইশরাক হোসেন দলীয় মনোনয়নপত্র বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদের কাছে জমা দেন। এরপর ডিএনসিসিতে মেয়র পদে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন তার মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে কাউন্সিলর পদে বিএনপির মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৪৭৬ প্রার্থী। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি দফতর সম্পাদক এবিএমএ রাজ্জাক জানান, কাউন্সিলর পদে তিন দিনে সর্বমোট ১৯৬টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ৩৪টি। শুক্রবার সন্ধ্যা নাগাদ সব কয়টি মনোনয়ন ফরম জমা পড়েছে। ঢাকার দুই সিটির তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর, বাছাই ২ জানুয়ারি, প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ জানুয়ারি, ভোট গ্রহণের দিন ৩০ জানুয়ারি। দুই সিটির ভোটগ্রহণ ইভিএমে নেয়ার কথা জানায় নির্বাচন কমিশন।
উত্তরে তাবিথ দক্ষিণে ইশরাক
জানুয়ারিতেই মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী
লোকসমাজ ডেস্ক ॥ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘এই জানুয়ারি মাসেই মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে। সে লক্ষ্যে ওয়েবসাইটে রক্ষিত পুরনো তালিকা স্থগিত করা হবে। অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম যাচাই-বাছাই করে সেগুলো বাতিল করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপত্তি যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের আইডি কার্ড দেওয়া হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের আধুনিক কার্ড দেওয়া হবে, যাতে কেউ জালিয়াতি করতে না পারে।’ জানুয়ারির ১৫ তারিখের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি করে পাসপোর্ট সাইজের ছবি স্ব স্ব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) দুপুরে যশোর সদরের খাজুরায় মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ’ উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের আগামী প্রজন্মকে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও বীরত্বের কাহিনী জানাতে হবে, ঠিক তেমনই হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামসের হত্যা, নারী নির্যাতন, দমনপীড়ন আর তাদের পৈশাচিকতা সম্পর্কেও অবহিত করতে হবে। যাতে করে তারা উভয়পক্ষের কথা জেনে বিচার করতে পারে। না হলে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আর বীরত্বের কথা ভুলে যাবে।’ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বর্তমান সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের যেন আর কষ্ট করে ব্যাংকে গিয়ে টাকা তুলতে না হয়, সেজন্য সরকার তাদের মোবাইলেই ভাতার টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। তাতে করে মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িতে বসেই তাদের প্রাপ্য অর্থ পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে ৩০ বছরই ক্ষমতায় ছিল মোশতাক, জিয়া, এরশাদ, খালেদা গং। আর বঙ্গবন্ধু সাড়ে তিন বছর এবং তার কন্যা শেখ হাসিনা ১৬ বছর। কিন্তু তারা দেশের জন্যে যে কাজ করেছে, তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি কাজ হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।’ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেন, “জয় বাংলা’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। আপনারা নিজ নিজ সন্তানকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভালোভাবে শিক্ষা দিন। তারা যদি ‘জিন্দাবাদের’ স্লোগানে লিপ্ত হয়, তাহলে আমাদের আর ইজ্জত থাকবে না।”
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও এমএন মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি এসএম আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য এমপি, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম মিলন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার রাজেক আহমেদ প্রমুখ। বক্তৃতাকালে পল্লি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা যদি বিজয় লাভ না করতে পারতাম, তাহলে হানাদার ও তাদের দোসররা আমাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতো। আমরা সৌভাগ্যবান, কেননা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছি। লাল-সবুজের এই পতাকা পেয়েছি। সেই যুদ্ধে বন্ধুরাষ্ট্র সহায়তা করেছিল; খাজুরায় যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ছয় সদস্য আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। আমরা তাদের স্মৃতি চিরজাগরূক রাখতে চাই।’
যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, ‘দেশের যে যে স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রয়েছে, যেখানে যেখানে বধ্যভূমি রয়েছে, সম্মুখযুদ্ধের ঘটনা রয়েছে, সেসব স্থানে বর্তমান সরকার স্মৃতিসৌধ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সময়ের বিবর্তনে আমরা একদিন হারিয়ে যাবো। কিন্তু এসব স্মৃতিসৌধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা চিরঅম্লান থাকবে। যারা নিজেদের জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে দেশমাতৃকার সম্ভ্রম রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, তাদের ঋণ কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার আগামী প্রজন্মের কাছে তাদের সেই বীরত্বগাথা অটুট রাখতে নিরলস কাজ করে চলেছে।’ বেলা সাড়ে ১১টায় খাজুরা এমএন মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক কোণে নির্মিত এই স্মৃতিসৌধের ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। এসময় তার সঙ্গে অন্যান্য অতিথিসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ১৯৭১ সালে যশোর মুক্ত দিবসের পরদিন ৭ ডিসেম্বর সকালে খাজুরায় রাজাকারদের সঙ্গে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ হয়। সেদিন রাজাকাররা মিত্রবাহিনীর ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে এবং একজন সদস্য আহত হন। পরে মিত্রবাহিনী রাজাকারদের ক্যাম্প ধ্বংস করে এবং তাদের প্রত্যেককে হত্যা করে। ঠিক এই স্থানেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ’। স্মৃতিসৌধের বেদি থেকে ১৪ ফুট উঁচু স্তম্ভ শ্বেত পাথরের। পুষ্পার্ঘ অর্পণের জন্য নির্মিত স্টেজটি কালো গ্রানাইটের, বেদি লাল সিরামিক ইট এবং স্তম্ভের মাঝে বৃত্তের অর্ধেক (বামপাশে) টকটকে লাল এবং বাকি অর্ধেক অংশ (ডানপাশে) সবুজ রঙের।
নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে ইরানের জ্বালানি তেল রফতানিতে
নভেম্বরের শুরুতে ইরানের ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়েছে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি খাতে। নভেম্বরে এশিয়ার দেশগুলোয় ইরানের প্রধান রফতানি পণ্য জ্বালানি তেলের চালান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এশিয়ার কয়েকটি দেশ ইরান থেকে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিশেষ ছাড় পাওয়ার পরও এ পরিস্থিতি তেহরানের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স ও অয়েলপ্রাইসডটকম।
ইরান থেকে রফতানি হওয়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান ক্রেতা চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত। নতুন করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পর ইরান থেকে এশিয়ার এ চার দেশে জ্বালানি পণ্যটির মাসভিত্তিক রফতানির পূর্ণাঙ্গ তথ্য যুক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রয়টার্স। ইরানের সরকারি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের নভেম্বরে ইরান থেকে এ চার দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৮০০ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ কম। গত পাঁচ বছরের মধ্যে নভেম্বরে এটাই ইরান থেকে এশিয়ার দেশগুলোয় জ্বালানি তেল রফতানির সর্বনিম্ন রেকর্ড।
২০১৮ সালের অক্টোবরে ইরান থেকে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ ৬২ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি হয়েছিল। সেই হিসাবে অক্টোবরের তুলনায় গত নভেম্বরে এ চার দেশে ইরান থেকে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি কমেছে দৈনিক ৯৮ হাজার ব্যারেল।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে থেকেই ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমিয়ে দিতে এশিয়ার দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করেছিল ওয়াশিংটন। এর জের ধরে আগস্টের পর থেকেই ইরানি জ্বালানি তেল আমদানি কমিয়ে দেয় জাপান। এক পর্যায়ে ইরান থেকে জ্বালানি পণ্যটির আমদানি স্থগিত করে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে ভারত দেশটি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছিল।
নভেম্বরের শুরুতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে ইরান থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে আটটি দেশকে বিশেষ ছাড় দেয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এ তালিকায় চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত রয়েছে। ছাড় পাওয়ার পরও এ চার দেশে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি বাড়াতে পারেনি তেহরান। অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে এসব দেশে ইরান থেকে জ্বালানি তেল রফতানি আরো কমেছে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের বিশ্লেষক ওয়াং তাও বলেন, ইরানি জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এশিয়ার দেশগুলো। ছাড়ের আওতায় থাকলেও এসব দেশ ইরান থেকে জ্বালানি পণ্যটি কিনছে না। এটি ইরানি অর্থনীতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতি ইরানের ক্রমবিকাশমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করতে পারে।
নির্বাচনকে ঘিরে যশোরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্যে
মাসুদ রানা বাবু ॥ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন কাজী পরিবারের এক সময়ের বিশ্বস্ত সিপাহশালার মোহিত কুমার নাথ। যিনি বর্তমানে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। গেল ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোহিত কুমার নাথ কাজী নাবিল আহমেদের প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন। তাদের সম্পর্কের চিড় ধরে ২০১৯ সালে। এরপর থেকে মোহিত কুমার নাথ চলে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের পক্ষে।
সেখান থেকে মাঠের রাজনীতিতে কাজী নাবিল আহমেদ ও মোহিত কুমার নাথ একে অপরের কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন। তারা এখন নির্বাচনের মাঠেও প্রতিপক্ষ। নির্বাচনের মাঠে তারা পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দিয়ে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। কাজী নাবিলের সাথে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ছাড়া দলের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাকে নির্বাচনের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। নেই শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক । অন্যদিকে মোহিত কুমার নাথের সাথে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহারুল ইসলামসহ দলের প্রতাপশালী নেতারা রয়েছেন।
আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর সদর আসনের মত বাকি ৫টি আসনেও আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের লড়াই চলছে। নির্বাচনকে ঘিরে যশোরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘ দিনের কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজ দলের কর্মী সমর্থকরা একে -অপরের সাথে সংঘর্ষ কিংবা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন। একে- অপরের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ কিংবা কর্মী -সমর্থকদের মারধিরের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। সেই সাথে নৌকা কিংবা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও তাদের কর্মী -সমর্থকদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য নির্বাচনের মাঠে রীতিমত তাপ উত্তাপ ছড়াচ্ছে।
যশোর-১ (শার্শা) আসন থেকে বর্তমান সংসদ শেখ আফিল উদ্দিন নৌকার মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচন করছেন। তার সাথে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটনের বিরোধী দীর্ঘদিনের। দীর্ঘদিন ধরে শার্শায় মাঠের রাজনীতিতে পরস্পর সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের করে আসছেন তারা। উপজেলাব্যাপী তাদের দ্বন্দ্ব সকলেরই জানা। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ও তারা একে- অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে থেকে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন ডা. তৌহিদুজ্জামান। ঝিকরগাছা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তিনি নতুন মুখ । তাকে ঘিরে ঝিকরগাছা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলামের দ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে এসেছে। দুই মনিরুল ইসলামের দ্বন্দ্ব দীর্ঘ দিনের সেটি কারো জানার বাইরে নয়। নির্বাচনকে ঘিরে তাদের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এই আসন থেকে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাড.মনিরুল ইসলাম মনির স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ঝিকরগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মুকুল, সাধারণ সম্পাদক মুছা মাহমুদসহ উপজেলার দাপটশালী নেতারা নির্বাচনে মনিরুল ইসলাম মনিরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আবার চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী মাসুদ চৌধুরীসহ উপজেলার একদল প্রতাপশালী নেতা মনিরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনের মাঠ কাঁপাচ্ছেন।
অন্যদিকে নৌকার প্রার্থী তৌহিদুজ্জামানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ঝিকরগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি চৌধুরী রমজান শরীফ বাদশা, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। এ আসন থেকে চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম হাবিবুর রহমান নির্বাচন করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। তবে মাঝপথ থেকে নির্বাচনী মাঠ থেকে এস এম হাবিবুর রহমানের সরে দাঁড়ানো নিয়ে নানা গুঞ্জন রয়েছে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসন থেকে নৌকার প্রাথী হয়েছেন এনামুল হক বাবুল। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য রনজিত কুমার রায়। তবে এনামুল হক বাবুলকে ঠেকাতে ঋণ সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে রনজিত কুমার রায়কে বেশ তৎপর হতে দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত এনামুল হক বাবুল উচ্চ আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পান। এরপর থেকে কার্যত রনজিত কুমার রায়কে নির্বাচনের মাঠে দেখা যায়নি। তবে রনজিত কুমার রায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন নাকি এনামুল হক বাবুলের প্রার্থিতা বাতিলের জন্যে ঢাকায় তৎপরতা চালাচ্ছে সেই গুঞ্জন রয়ে গেছে।
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসন থেকে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠে আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ও জেলা কৃষকলীগের সহসভাপতি এস এম ইয়াকুব আলী। মনিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মাহমুদুল হাসান নৌকার প্রার্থীর হয়ে কাজ করলেও সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন নিশ্চুপ। তিনি কোনো পক্ষে অবস্থান নেননি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম-সম্পাদক শামসুল হক মন্টু বলেন, বর্তমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মিকাইল হোসেন, গৌর ঘোষ, বাবুল আক্তার, সাংগঠনিক সম্পাদক সন্দীপ ঘোষসহ উপজেলা বর্তমান নির্বাহী কমিটি সিংহভাগ নেতা এসএম ইয়াকুব আলীর হয়ে নির্বাচন করছেন। এই আসনে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিন থেকে উত্তেজনা চলছে। নৌকা প্রতীকের অনুসারীরা নির্বাচনের প্রচারণার প্রথম দিন থেকে সর্বোচ্চ পেশীশক্তি প্রয়োগ করছেন। সাধারণ ভোটারদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানোসহ স্বতন্ত্র প্রাথীর ঈগল প্রতীকের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুরসহ কর্মী সমর্থকদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসন থেকে নির্বাচন করছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার ও তার বিপক্ষে নির্বাচন যুুদ্ধে নেমেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এইচ এম আমির হোসেন। কেশবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতাপশালী নেতারা এইচ এম আমিরের হোসেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনে কাজ করছেন। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে তার পক্ষে মাঠে নেমেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গৌতম রায়, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শাহাদৎ হোসেন, যুবলীগের আহ্বায়ক বিএম শহিদুজ্জামান শহীদ, ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক পলাশ মল্লিক ও হাবিবুর রহমান মুকুলসহ তাদের অনুসারী উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা কোনো পক্ষের হয়ে মাঠে নামেননি।
আবার শাহীন চাকলারের পক্ষে স্থানীয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম রুহুল আমিন ছাড়া উপজেলার প্রতাপশালী কোনো নেতাকে নির্বাচনের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। যশোর শহর ও সদর উপজেলা থেকে প্রতাপশালী নেতারা সেখানে গিয়ে শাহীন চাকলাদারের পক্ষে নির্বাচনের মাঠ কাঁপাচ্ছেন। অতি সম্প্রতি এখানে শাহীন চাকলাদারের নির্বাচনী অফিসে অগ্নিসংযোগ করার ঘটনাও ঘটেছে।
যশোরে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পেশীশক্তি প্রয়োগের ঘটনা রীতিমত জেলাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষও তাই ভীতসন্ত্রস্ত্র।
এ বিষয় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, নির্বাচন ভালো চলছে। নির্বাচন নিয়ে যা কিছু হচ্ছে এতে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না। এখন যেটা হচ্ছে ভোটের পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। ভাই ভাই মাঝেমধ্যে একটু মারামারি হয়। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। বাইরে কোনো লোক এক ভাইয়ের ওপর আক্রমণ করলে আরেক ভাই বসে থাকে না।




