২০ ঘণ্টায় ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত যশোরে শহরের অনেকাংশ জলমগ্ন 

0
ছবি: লোকসমাজ।

তহীদ মনি ॥ যশোরে প্রায় ২০ ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে। কখনও হালকা, কখনও ভারী এবং কখনও মুষলধারে ঝরেছে ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার বেলা ২টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে এই বৃষ্টিতে যশোর শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। শহরের প্রায় সবকটি ওয়ার্ডের সড়ক ও বাড়ির ভেতর পানিতে তলিয়ে যায়।

দুপুর পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে। বিশেষ করে শহরের ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানিতে সয়লাব হয়ে থাকে। কয়েক হাজার পরিবারে রান্নাবান্না বন্ধ হওয়ায় দুপুরে এই ওয়ার্ডের কয়েক হাজার মানুষকে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। পৌর কর্তৃপক্ষ এত ক্ষতির কথা মানতে রাজি হয়নি।

তাদের দাবি, শুক্রবার রাতের মধ্যে সব পানি নেমে যাবে। তবে ৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা বিকেল পর্যন্তও পানিতে প্লাবিত ছিল। পৌরসভা সকাল থেকে পানি অপসারণে কাজ করে যাচ্ছে।

যশোর বিমানবাহিনীর মতিউর রহমান ঘাঁটির আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত যশোরে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি দুপুর ১টা পর্যন্ত লাগাতার ছিল।

খুলনা আবহাওয়া অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত রাতের একটি দীর্ঘ সময় অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে যশোরে। আগামী ২৪ ঘণ্টা তা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ঢাকা আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর শুক্রবার দুপুরে জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টায় যশোরে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার বেলা ২টা পর্যন্ত এই ২০ ঘণ্টায় মোট ১৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এটা এই মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত বলে অভিমত জানিয়েছেন শহরের অনিসুজ্জামান, আবুর রশীদ, আবু হানিফসহ অনেকেই। একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, এই দুই বছর যশোরে আছি, তবে একসাথে এত বৃষ্টিপাত দেখিনি এখানে।

সরেজমিন দেখা যায়, মুষলধারে বৃষ্টিতে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে শহরের মধ্যবর্তী বেজপাড়া, নাজির শংকরপুর ও শংকরপুর, পিটিআই সড়ক, এমএম কলেজ এলাকা, খড়কি পীর বাড়ি এলাকা, ষষ্ঠীতলা, রেল রোড, টিভিক্লিনিক এলাকা, ফায়ার সার্ভিস এলাকার সড়ক, বসন্ত কুমার রোড, সার্কিট হাউজ পাড়া, গাজীরঘাট এলাকা, চাঁচড়ার বিস্তীর্ণ অংশ, পূর্ব বারান্দী পাড়ার লিচুবাগান, সর্দারপাড়া, নদীরপাড় এলাকা ও বারান্দী মোল্লাপাড়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। এছাড়া শহর সংলগ্ন যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ উপশহর এলাকার প্রায় পুরো অংশই দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতার শিকার হয়।

দুপুরে বৃষ্টি কমলে কোনো কোনো এলাকার পানি কিছুটা নেমে গিয়ে সড়কের বেশিরভাগ জেগে ওঠে। তবে তারপরও শহরের ৫ নম্বর ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাপক অংশে পানি জমে থাকায় অসংখ্য পরিবারে দুপুরে রান্না করতে পারেনি। সকালেও তারা ছিল রান্না বিহীন অবস্থায়।

ছবি: লোকসমাজ।

এমতাবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের নির্দেশনায় জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েক হাজার মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়।

শহরের বেজপাড়া, শংকরপুর, টিভিক্লিনিক, খড়কি, সার্কিট হাউজপাড়াসহ কয়েকটি এলাকার পানি সন্ধ্যার আগে নেমে না যাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা প্রশ্ন তোলেন, এত খরচ করে পৌরসভার ড্রেনের ময়লা অপসারণ করে এবং কয়েকটি খাল পরিষ্কার করে কী লাভ হলো?

এ বিষয়ে একাধিকবার পৌর প্রশাসক ও জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসানের ফোনে কল ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুণ্ডু দৈনিক লোকসমাজকে জানান, অনেক বৃষ্টি হয়েছে, একসঙ্গে এত পানি এত তাড়াতাড়ি নেমে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। তারপরও অন্যবারের চেয়ে অনেক আগে পানি অপসারিত হচ্ছে। পানি বের হয়ে যাওয়ার পথ বিল হরিণা, মুক্তেশ্বরী ও ভৈরব নদে পতিত হওয়ার স্থানে খুবই স্রোত-পানি দ্রুতই নামছে। খুব বেশি সমস্যা ৫ নম্বর ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে।

বিশেষ করে টিভি ক্লিনিক এলাকার ড্রেন এখনো নির্মাণ শেষ হয়নি; খড়কি পীর বাড়ি এলাকায় যদি পৌরসভা ড্রেন করার সুযোগ পেত, সেখান থেকে পানি দ্রুত নামানো সম্ভব হতো; এমএম কলেজের দক্ষিণ গেটে রাস্তার কাজ চলছে, সেখানে পানি আটকে থাকছে; অফরিন পাম্প, কবিরের মোড়, সেতু ভাইয়ের বাড়ির সামনের এলাকা থেকে পানি অপসারণ একটু দুরূহ হচ্ছে।

তাছাড়া কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে বিল হরিণা হয়ে মুক্তেশ্বরীতে যে পানি যাচ্ছে, সেখানে খালে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সাধারণত ৫, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পানি এই পথে বের হয়। এছাড়া অন্য অংশের পানি ভৈরব নদে পড়ে।

পৌরসভার পক্ষ থেকে গাজীরঘাট এলাকা থেকে চাঁচড়া পর্যন্ত এস্কেভেটর দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে, এছাড়া অন্যান্য খাল প্রায় ৫ কিলোমিটার সংস্কার করা হয়েছে। এসবের ফলে এ বছর পানি অতি দ্রুত নেমে যাচ্ছে।

সকাল থেকে পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার, পৌর প্রকৌশলী কামাল আহমেদসহ কর্মকর্তারা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন, সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন এবং সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ জন সুপারভাইজার ও ১৮-২০ জন শ্রমিক নিয়ে যেখানে প্রতিবন্ধকতা, সেখানে ড্রেনের মুখ অপসারণসহ পানি নিষ্কাশনে কাজ করছেন। আশা করা যায়, রাতের মধ্যে সকল স্থান থেকে পানি নেমে যাবে, স্থায়ী জলাবদ্ধতা হবে না।