সুন্দরবন অঞ্চলে লোনা পানির কুমির প্রজনন ক্ষমতা হারাচ্ছে

0

মনিরুল হায়দার ইকবাল, মোংলা (বাগেরহাট) ॥ সুন্দরবন এলাকাতেই প্রাকৃতিক পরিবেশে লোনা পানির কুমির দেখা যায়। কিন্তু বন সংলগ্ন নদ নদীতে লোনা পানির এই কুমিরের প্রজনন ক্ষমতা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এ প্রজাতির কুমিরের প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এই প্রজাতির কুমির উঁচু জায়গায় ডিম পাড়ে এবং শুকনো ও উষ্ণ জায়গায় ডিমে তা দেয়। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনসহ সংলগ্ন বেশিরভাগ এলাকার নদীতে পলি জমে পানির স্তর ওপরে উঠে গেছে। নদীর পাড়ে বাচ্চা ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় শুষ্ক ও উষ্ণ জায়গা পাচ্ছে না এই জাতের কুমির। সুন্দরবনের কুমির নিয়ে গবেষণাকারী বিশেষজ্ঞরা এমন তথ্য জানিয়েছেন।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির জানান, বিলুপ্ত প্রায় লোনা পানির কুমির সংরক্ষণ ও এর বংশ বৃদ্ধির জন্য ২০০০ সালে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই স্টেশনের অধীন করমজলে সরকারিভাবে কুমির প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে দুটি বড় কুমির দিয়ে এর যাত্রা শুরু করা হলেও পরে কুমিরের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো হয়। বর্তমানে এ প্রজনন কেন্দ্রে ছোট বড় মিলিয়ে ১০৯টি লবণ পানির কুমির রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ডিম থেকে কৃত্রিমভাবে ফোটানো ২০৬ টি ছোট বড় কুমির সুন্দরবনের বিভিন্ন নদ নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন সময়ে নদ নদীতে ছাড়া এসব কুমির ও বাচ্চা স্বাভাবিক পরিবেশে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে। এই প্রজাতির কুমির উঁচু জায়গায় ডিম পাড়ে এবং শুকনো ও উষ্ণ জায়গায় ডিমে তা দেয়। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের বেশিরভাগ নদী এলাকায় নদীতে পলি জমে পানির স্তর ওপরে উঠে গেছে। ফলে বাচ্চা ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় শুষ্ক ও উষ্ণ জায়গা পায় না এই জাতের কুমির। ফলে কুমিরের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। প্রজনন কেন্দ্রের বাচ্চা কুমির বড় হলেও নদীতে ছেড়ে দেওয়া কুমিরগুলো তেমন বড় হচ্ছে না এবং নতুন করে পর্যাপ্ত ডিম দিচ্ছে না। বন বিভাগ কুমিরের ডিম পাড়া ও দুর্যোগে বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য সুন্দরবনের গহীনে উঁচু করে টাইগার টিলা তৈরি করলেও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সেখানে গিয়ে কুমির তেমন ডিম পাড়ছে না।
এদিকে নদ নদীতে ছাড়া কুমিরগুলো পরিবেশের সাথে টিকতে না পেরে মাঝে মধ্যে লোকালয়ের পুকুর ও ঘেরে উঠে আসছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি মোংলা উপজেলার বাঁশতলা এলাকার হলদিবুনিয়া গ্রামের একটি ঘেরে মাছ ধরার সময় জালে একটি কুমিরের বাচ্চা ধরা পড়ে। পরে ওই বাচ্চাটিকে উদ্ধার করে সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত করে বনবিভাগ। কুমিরটির বয়স এক বছরের বেশি হয়ে ছিল বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, গত দুই বছরে আমরা লোকালয়ের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ১১টি কুমির উদ্ধার করেছি। পরে ওই কুমিরগুলোকে গহীন সুন্দরবনে নিয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে।
কুমির বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বন কর্মকর্তা আব্দুর রব বলেন, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কেবল সুন্দরবন এলাকাতেই প্রাকৃতিক পরিবেশে লোনা পানির কুমির দেখা যায়। লোনা পানির কুমিরের এই প্রজাতির প্রজনন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এই প্রজাতির কুমির উঁচু জায়গায় ডিম পাড়ে এবং শুকনো ও উষ্ণ জায়গায় ডিমে তা দেয়। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনের বেশিরভাগ এলাকায় নদীতে পলি জমে পানির স্তর ওপরে উঠে গেছে। ফলে বাচ্চা ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় শুষ্ক ও উষ্ণ জায়গা পায় না এই জাতের কুমির।
তিনি আরও বলেন, মূলত ডিম পাড়ার উদ্দেশ্যে লোকালয় সংলগ্ন সুন্দরবনের উঁচু জায়গা বেছে নিচ্ছে মা কুমির। ওই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে কিছু কিছু বাচ্চা ওই এলাকার আশপাশে থেকে যাচ্ছে। ফলে জোয়ার বা খাবারের খোঁজে বিভিন্ন ঘেরে ঢুকে পড়ছে কুমির।
এই দুই কুমির বিশেষজ্ঞই লোনা পানির কুমিরের বংশ বিস্তারে সুন্দরবন অঞ্চলের নদীর পাড়ে কুমিরের ডিম পাড়ার জন্য উঁচু করে টিলা তৈরি করার জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।