সদর হাসপাতালের চারপাশে ৫০ ক্লিনিক, প্রধান কাজ রোগী ভাগানো

0

বিএম আসাদ ॥ যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতালের চতুর্দিকে ক্লিনিক আর ক্লিনিক। এক ভবনে দুই-তিনটি ক্লিনিক, এমনকি এক ছাদেও গড়ে উঠেছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। বাইরে থেকে সাইনবোর্ড দেখে ক্লিনিকের দরজা খুঁজে পাওয়াও দুস্কর। এমনকি একই সিঁড়ি ও লিফট ব্যবহার করছে একাধিক ক্লিনিক। চটকদার নামের আড়ালে এসব ক্লিনিকের নেই নিজস্ব কোনো রোগী।

হাসপাতালে আসা সহজ-সরল মানুষই তাদের প্রধান টার্গেট। ফলে পুরোপুরি দালালনির্ভর হয়ে পড়েছে এসব প্রতিষ্ঠান, যাদের খপ্পরে পড়ে অকাতরে টাকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা।

যশোরে সরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এভাবে গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এক প্রকার গিজগিজ করছে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

দালালনির্ভর এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কারণে হাসপাতালে দালালের উপদ্রব বেড়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান কমপক্ষে ৫০০ মিটার দূরে নির্মাণ করার নিয়ম থাকলেও বেসরকারি মালিকরা ওই নিয়ম মানছেন না। সকলেই সরকারি হাসপাতালের ১০ গজ থেকে ৫০ গজ দূরত্বে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করেছেন।

এসব হাসপাতালের নিজস্ব কোনো রোগী নেই। সরকারি হাসপাতালের রোগীদের নানা রকম ভুল বুঝিয়ে তাদের ক্লিনিকে নেওয়া হচ্ছে। আর এসব রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার মূলে রয়েছে ওইসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পোষা দালাল। যাদের পরিচয় দেয়া হয় কর্মচারি হিসেবে। নানা পোশাকে, আবার কখনো সরকারি হাসপাতালের কর্মচারীদের পোশাকে এসব দালালরা যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে প্রবেশ করে।

তাদের দেখে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সহজ-সরল রোগীরা সরকারি হাসপাতালের লোক মনে করে তাদের কাছে সহযোগিতা চান। এ সময় দালালরা বোগীদের বোঝান সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা হয় না, ডাক্তার বেসরকারি হাসপাতালের চেম্বারে বসে আছেন, এরকম নানা ছলনা করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগী নিয়ে যায়। সেখানে নিয়েই সরকারি টিকিটগুলো ক্লিনিকের রিসিপশন থেকে নিজেদের হস্তগত করা হয়।

এরপর দীর্ঘ সময় বসিয়ে রেখে চিকিৎসার নামে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। আর দালালরা এর কমিশন নিয়ে ভেগে যায়। সরকারি এ হাসপাতালের সামনে অবস্থিত এক একটি বিল্ডিংয়ে ৫ থেকে ৭টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে।

সরকারি বিধিমালা মোতাবেক এসব ভবনের অবস্থান নেই। নেই পরিবেশের ছাড়পত্র সম্বলিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বাসা-বাড়িতে এখন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তৈরি করে চমকপ্রদ ব্যবসা করা হচ্ছে। আর রাতারাতি মালিকরা আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। অথচ মানসম্মত চিকিৎসা নেই। সামান্য পয়সা হলে কয়েকজন মিলে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এক একটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার তৈরি করে বসছেন।

আর চিকিৎসক সহজলভ্য হয়ে গেছেন। তারা একাধিক ক্লিনিকে বসে রোগী দেখছেন এবং ফি নিয়ে চলে যাচ্ছেন। রোগী কতটুকু সুস্থ হচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই ওই সকল চিকিৎসকদের।

এভাবে হাসপাতালের সামনে ও চারপাশে কমপক্ষে ৫০টির মতো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। তাদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগানোর ব্যবসা। যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে যোগাযোগ করে জানা গেছে, প্রতিদিন হাসপাতালে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এর সিংহভাগ রোগী দালালরা ভাগিয়ে এসব বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যায়।

আর সরকারি হাসপাতালে যেসব প্যাথলজি পরীক্ষা হয়, তার বেশিরভাগই হাসপাতালে ভর্তি থাকা চিকিৎসাধীন রোগীর। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা শতকরা ৭০ ভাগ রোগী দালালরা ভাগিয়ে ওইসব ক্লিনিকে নিয়ে যায়।

হাসপাতাল-সংলগ্ন এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সিংহভাগই সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান হওয়ায় দালালদের তৎপরতা এভাবে অব্যাহত রয়েছে। জেলায় ৯৭টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে, যারা লাইসেন্সধারী। লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকের সংখ্যা আরও বেশি। লাইসেন্সধারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৬৩টি।

কিন্তু এসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অবস্থান সরকারি হাসপাতাল থেকে দূরত্ব কত হওয়া উচিত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না হাসপাতাল ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাবৃন্দ। সাধারণ মানুষের অভিমত, সরকারি হাসপাতাল হতে ৫০০ মিটার দূরত্বে হওয়া উচিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান হওয়া উচিৎ।

ছবি: লোকসমাজ।

এ বিষয় নিয়ে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দূরত্ব ৩০০ মিটার বলে আগে জানতাম। এখন সে দূরত্বের বিষয়টি মনে নেই। হাসপাতাল-সংলগ্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান হওয়ায় সুষ্ঠু চিকিৎসার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দালালের উৎপাত সব সময় অব্যাহত থাকছে। তাদের ধাওয়া করেও তেমন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দূরত্বের নিয়ম আগে থাকলেও থাকতে পারে, তবে সেটি এখন কার্যকর নেই। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না এখন। তবে এমন আইন থাকা ভালো।

তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে একটা গাইডলাইনের জন্য লেখালেখি করবেন। এমন নিয়ম থাকলে কাজ করতে সুবিধা হয় বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা।