রাস্তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি ৫৫ বছরে, দুর্ভোগে ১০ গ্রামের মানুষ

0
ছবি: লোকসমাজ।

শিপলু জামান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)॥ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও পাকা রাস্তার মুখ দেখেননি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের আড়ুয়াশালুয়া গ্রামের মানুষ। বছরের পর বছর রাস্তা পাকাকরণের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বর্ষায় কাদাপানি আর শুষ্ক মৌসুমে খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদিত ফসল মাঠ থেকে বাড়িতে নিতে তাঁদের বাড়তি শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বহন করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, নিয়ামতপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আড়ুয়াশালুয়া গ্রামের বিস্তীর্ণ কৃষিজমির মধ্য দিয়ে যাওয়া কাঁচা রাস্তাটি আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এ মাঠে ধান, গম, মসুর, কলাইসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়। প্রতিদিন কৃষিকাজ ও যাতায়াতের প্রয়োজনে কৃষক, শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাস্তাটি ব্যবহার করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বর্ষা মৌসুমে রাস্তাজুড়ে কাদা ও পানি জমে থাকে। তখন পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমে কাদাপানি না থাকলেও গর্ত, উঁচু-নিচু মাটি ও খানাখন্দের কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়।

বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে চলাচল করতে গিয়েও বিপাকে পড়েন মানুষ। অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াতেও ভোগান্তি পোহাতে হয়।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ফসল উৎপাদনের পর তা মাঠ থেকে বাড়িতে নেওয়াই তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়তি সময়, শ্রমিক ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি ফসল ঘরে তোলার ব্যয়ও বাড়ছে। সময়মতো ফসল পরিবহন করতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় থাকতে হয় তাঁদের।

কৃষক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠে ফসল ফলাতে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। ফসল ঘরে তোলার সময় এই রাস্তার কারণে নতুন করে দুর্ভোগে পড়তে হয়। রাস্তা ভালো না থাকায় ফসল পরিবহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা চাই, দ্রুত রাস্তাটি পাকা করা হোক।’

কৃষক মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষার সময় রাস্তা দিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর। ফসল নিয়ে মাঠ থেকে বের হওয়া যায় না বললেই চলে। শুকনো মৌসুমেও গর্তের কারণে সমস্যা হয়। রাস্তা ভালো হলে কৃষিকাজের খরচ কমবে, সময় বাঁচবে এবং উৎপাদিত ফসল সহজে বাড়িতে নিতে পারব।’

কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই রাস্তার দুর্ভোগ সহ্য করছেন।

কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বছরের পর বছর রাস্তা পাকা করার কথা শুনছি, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আমরা আর আশ্বাস নয়, বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চাই।’

স্থানীয় বাসিন্দা মহাব্বত আলী বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ চলাচল করেন। বর্ষায় কাদা জমলে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ মানুষকে নিয়ে যাতায়াত করতেও সমস্যা হয়। জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় রাস্তা উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।’

স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হোসেনের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে রাস্তা সংস্কার ও পাকাকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না। এলাকার মানুষ প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দ্রুত রাস্তাটি পাকা করা হলে কৃষকসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।

এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তা সংস্কার ও পাকাকরণের কথা বলা হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে তাঁদের দুর্ভোগের অবসান হচ্ছে না। কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন চলাচলে ভোগান্তি কমাতে তাঁরা দ্রুত রাস্তাটি সংস্কার ও টেকসইভাবে পাকাকরণের দাবি জানিয়েছেন।

আইডি না থাকায় আটকে ছিল পাকাকরণের উদ্যোগ
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব ও আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিয়ামতপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তিনি ইউনিয়নের ছোট-বড় প্রায় ৭০টি রাস্তা সংস্কার, নির্মাণ ও পাকাকরণের কাজ করেছেন। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। রাস্তাটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং এটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

মাহবুবুর রহমান মিলন আরও বলেন, এত দিন রাস্তাটির আইডি না থাকায় পাকাকরণের কাজ করা সম্ভব হয়নি। আইডি পাওয়ার জন্য উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ে আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বরাবর রাস্তাটি পাকাকরণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, উপজেলার যেসব রাস্তার এখনো আইডি হয়নি, সেগুলোর আইডি করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আড়ুয়াশালুয়া গ্রামের রাস্তাটির আইডি করার জন্যও আবেদন করা হয়েছে। রাস্তাটি পাকাকরণের জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়েও আবেদন করা হয়েছে। আইডি সম্পন্ন হলে দরপত্রের মাধ্যমে পাকাকরণের কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে কবে রাস্তাটি পাকা হবে, এখন সেই অপেক্ষায় আড়ুয়াশালুয়াসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ ও কৃষকেরা।