যেদিকেই তাকাবেন শুধু লাশ আর অ্যাম্বুলেন্স’

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥করোনা মহামারির দ্বিতীয় দফা ঢেউ চলছে ভারতে। দেশটিতে দৈনন্দিন সংক্রমণের গড় গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দুই লাখের ওপরে। দেশটির যে কয়টি রাজ্যে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে অন্যতম উত্তর প্রদেশ। অথচ রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রশাসন সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করছে।
গত শুক্রবার ৫৮ বছরের নিরঞ্জন পাল করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মৃত্যু হয়েছে তার অ্যাম্বুলেন্সে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিরঞ্জনের পরিবারের সদস্যরা ছোটাছুটি করেছিল। কিন্তু কোনো হাসপাতালেই বেড মেলেনি।
গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তপ্রদেশে করোনার কবলে পড়েছেন ২৮ হাজারের বেশি মানুষ। মারা গিয়েছেন ১৬৭ জন। মহামারি শুরুর পর রাজ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ হাজার।
মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন দাবি করেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বাস্তবচিত্র হচ্ছে, করোনা শনাক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ব্যাপক ভীড়, বেড না থাকায় হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে মৃতদেহ। সংক্রমণের হিসেবে প্রতিদিন রাজ্যের সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে রাজধানী লখনৌ, কানপুর, বারনাসী ও এলাহাবাদের মতো বড় শহরগুলো।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশের বাসিন্দার সংখ্যা ২৪ কোটি। পৃথক দেশ হলে এটি চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ হতো। রাজনৈতিকভাবেও রাজ্যটির গুরুত্ব অনেক বেশি। ভারতের পার্লামেন্টে ৮০ জন এমপি রয়েছে উত্তর প্রদেশের। গুজরাটের বাসিন্দা হলেও খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই রাজ্যের আসন থেকে নির্বাচিত।
করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথসহ তার বেশ কয়েক জন মন্ত্রী। তবে রাজ্যের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক মানতে নারাজ তিনি। এলাহাবাদ হাইকোর্ট করোনা ভাইরাসের লাগাতার বৃদ্ধি দেখে পাঁচটি বড় শহরে ২৬ এপ্রিল অবধি সম্পূর্ণ লকডাউনের আদেশ দিয়েছিল৷ এর বিরুদ্ধে আপিল করেছিল যোগী সরকার। মঙ্গলবার শেষ পর্যন্ত আপিলের রায়ে হাইকোর্টের আদেশে স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে বেড না থাকায় অনেক রোগীকে মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো রোগী ভর্তি নিচ্ছেই না। সরকারি কাশিরাম হাসপাতালের বাইরে বসে কাঁদছিলেন এক নারী। বিবিসির সাংবাদিককে তিনি জানান, তার মাকে দুটি হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ওই নারী বলেন, ‘তারা বলছে বেড খালি নাই। যদি বেড না থাকে তাহলে তাকে অন্তত মেঝেতে রাখুন, কিছুতো চিকিৎসা দিন। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন পর্যাপ্ত বেড রয়েছে। এগুলো কোথায় দয়া করে আমাকে দেখান। দয়া করে আমার মায়ের চিকিৎসা করুন।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র নগরী হচ্ছে বারনাসি। এই শহর থেকেই মোদি এবার নির্বাচিত হয়েছেন। নগরীর বাসিন্দা বিমল কাপুরের মা গত বৃহস্পতিবার মারা যান।
নগরীর পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক মানুষকে অ্যাম্বুলেন্সে মারা যেতে দেখেছি। বেড না থাকায় হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছে। ওষুধের দোকানগুলোতে করোনার প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই এবং অক্সিজেন সরবরাহ অনেক কম।’
বিমল কাপুর জানান, শেষকৃত্যের জন্য তিনি তার মায়ের দেহ শশ্মানে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে দাহের জন্য লাশের স্তুপ জমে গেছে। লাশ পোড়ানোর কাঠের দাম বেড়ে গেছে তিন গুণ।
তিনি বলেন, ‘আমি এর আগে কখনো এমন দেখিনি। যেদিকেই তাকাবেন আপনি অ্যাম্বুলেন্স আর মৃতদেহ দেখতে পাবেন।’