যশোর পৌরসভার ড্রেন থেকে উঠছে ট্রাক ট্রাক মাটি, বেরিয়ে আসছে কাউন্সিলরদের অনিয়ম দুর্নীতি

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ এক পশলা বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়া যশোরবাসীকে বছরের পর বছর বোকা বানিয়ে রেখেছিল আওয়ামী আমলের জনপ্রতিনিধিরা। সামান্য কাদা তুলে লোক দেখানো ড্রেন পরিস্কারের নামে তারা আত্মসাত করে কোটি কোটি টাকা। বর্তমানে ড্রেন পরিস্কারকালে উঠে আসছে ট্রাক ট্রাক মাটি। বর্ষা আগেই পৌরকর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন পৌরবাসী।

পৌরসভার একটি সূত্র থেকে জানা যায়, বিগত দিনে পৌরসভার ড্রেন পরিস্কারের জন্য প্রতি মাসে প্রতিজন কাউন্সিলরের রবাদ্দ ছিল ৬০টি শ্রমিক। যাদের মজুরি ছিল ৪০০ টাকা। এ হিসেবে একেকজন কাউন্সিলর প্রতিমাসে ড্রেন পরিস্কারের নামে ২৪ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন। প্রতিমাসে ১২ জন কাউন্সিলর এই বাবদ উত্তোলন করেছেন ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। প্রতি বছর এই টাকার পরিমাণ দাড়ায় ৩ কোটি ৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সেই সময়ের জনপ্রতিনিধিরা পৌরসভার ড্রেন পরিস্কারের টাকা কোথায় ব্যয় করেছেন তার কোন হদিস নেই। খোদ পৌরসভার কর্মকর্তা বলছেন, তারা কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করে আত্মাসৎ করেছেন।

পৌরসভা সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ২২ কিলোমাটির ড্রেন পুনঃনির্মাণ করে তৎকালীন পৌরকর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে আর ড্রেন পরিস্কার হয়নি। পরিস্কার না করায় ময়লায় ড্রেনের বেশির ভাগ অংশ ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন হয় না। বর্ষা হলে পুরো শহর তলিয়ে যায়। জনসাধারণের চলাচলের ক্ষেত্রে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

গেল ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা দায়িত্ব পেয়ে জনপ্রনিধিদের অপাসরণে করে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রশাসক নিয়োগের পর যশোর পৌর কর্তৃপক্ষ পৌরবাসীর দীর্ঘ দিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ কাজে বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা। ইতিমধ্যে শহরের ভোলাট্যাংক রোড, মুজিব সড়ক, রেল রোডসহ বিভিন্ন স্থানে ড্রেন পরিস্কার করা হয়েছে।

 

গতকাল সোমবার আইনজীবী ভবন, প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে গিয়ে দেখা যায়, ড্রেন পরিস্কার করে ময়লা ড্রেনের পাশে রাখা হয়েছে। তবে ময়লার স্তুপ দেখে মনে হয় এটি ড্রেনের জমে থাকা কোন ময়লা নয়, হয়তো গর্ত খুড়ে মাটি ঢিবি করে রাখা হয়েছে। স্তূপ করে রাখা ময়লা আর্বজনা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া পথচারী নাসির উদ্দিন বলেন, ট্রাক ট্রাক ময়লা এভাবে ড্রেন থেকে তোলা হচ্ছে। এই প্রথম এভাবে ড্রেন পরিস্কার করা হচ্ছে। বিগত দিনে আমরা পৌরবাসী কেবল কর দিয়েছি বিনিময়ে পৌর প্রতিনিধিরা আমাদের করের টাকা পকেটস্থ করে ড্রেনের ময়লা পর্যন্ত পরিস্কার করেনি।

সোমবার দুপুরে কথা হয় ভোলা ট্যাংক রোডের বাসিন্দা ফরিদা আক্তারের সাথে। তিনি পৌরসভার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিগত দিনে আমরা এলাকার কোন ড্রেন পরিস্কার করতে দেখিনি। এই প্রথম ড্রেন এমন ভাবে পরিস্কার করা হচ্ছে যা দেখে আমরা পৌরবাসীবাসী মুগ্ধ। যেখানে ড্রেনের স্লাভ থেকে শুরু করে তল পর্যন্ত পরিস্কার করা হচ্ছে। বিগত দিনে জনপ্রতিনিধিরা ড্রেন পরিস্কার না করায় আমরা জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই ব্যাপক জলাবদ্ধতার শিকার হতে হয়। আশা করছি এবার পৌরসভার এই উদ্যোগের ফলে আমরা জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবো।

তবে এতদিনে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি তাহলে কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করেছেন? এই প্রশ্নে পৌরসভার অধিকাংশ কর্মকর্তা বলছেন বর্তমানের কাজের অবস্থা থেকে সেটিই প্রমাণিত হয়। এ বিষয় পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিএম কামাল আহম্মেদ বলেন, ড্রেনের ময়লা আর্বজনা দেখে মনে হচ্ছে বিগত দিনে জনপ্রতিনিধিরা হয়তো কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করেছে। যত্রতত্রভাবে কাজ করেছে শ্রমিকের মাথা বিক্রি করে টাকা আত্মসাৎ করেছে।

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার কুন্ডু বলেন, প্রশাসনক নিয়োগের পর গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে ড্রেন পরিস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। পৌর এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে কাজ চলমান রয়েছে। প্রতিদিন ৯টি ওয়ার্ডে ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক এ কাজে নিয়োজিত আছে, কাজের তদারকির জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে ইন্সপেক্টর রয়েছেন। ড্রেনের ওপর থেকে একদম নিচ পর্যন্ত জমে থাকা ময়লা পরিস্কার করে ড্রেনের গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে। যাতে করে সহজেই পানি নিষ্কাশন হয়। বর্তমানে ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি আগামী এপ্রিল মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে।