যশোরে ৯৬ হাজার কুরবানির পশুর চাহিদা মিটিয়েও অন্য জেলায় সরবরাহ সম্ভব

0
ছবি: লোকসমাজ।

আকরামুজ্জামান ॥ যশোরের ১৪ হাজার খামারি লক্ষাধিক পশু কুরবানির জন্যে প্রস্তুত করেছেন। জেলার প্রায় ৯৬ হাজার পশুর চাহিদা মিটিয়েও অন্য জেলায় সরবরাহ সম্ভব। তাপরও খামারি ও গ্রামাঞ্চলের পশুপালন করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মনে দাম পাওয়া না পাওয়া নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।

ঈদুল আজহা সামনে রেখে যশোরের গ্রামাঞ্চলে এখন কুরবানির পশুর শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও কৃষকরা। খামারে খামারে বাড়তি যত্নে লালন-পালন করা হচ্ছে গরু, ছাগল ও ভেড়া। কয়েক মাসের শ্রম, বিনিয়োগ আর স্বপ্ন ঘিরে এবারও কুরবানির বাজারকে কেন্দ্র করে বড় প্রত্যাশা তাদের। তবে সেই আশার পাশাপাশি খামারিদের মনে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তাও।

গত বছরের কুরবানির বাজারে লোকসান, শেষ মুহূর্তে কম দামে পশু বিক্রি, অবিক্রীত গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা এবং বাজার সিন্ডিকেটের অভিযোগ এখনও তাড়া করে ফিরছে অনেককে। ফলে এবার পশুর সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না খামারিদের মধ্যে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আট উপজেলায় এবার কুরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু। এর মধ্যে গরু রয়েছে ৩৬ হাজার ২৫৯টি, ছাগল ৮১ হাজার ২৭৬টি এবং ভেড়া ৪৪২টি।

জেলায় কুরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৯৫ হাজার ৮১২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৮৪৯টি পশু দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এবার পশু বিক্রি থেকে কয়েকশ কোটি টাকার বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি। একই সঙ্গে যশোরের কুরবানির চামড়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম রাজারহাটের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি জানান, জেলার আট উপজেলায় নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৪০টি এবং গবাদিপশু চাষির সংখ্যা ১৪ হাজার ১৩৫ জন। খামারিদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভা করা হচ্ছে, যাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করা হয়।

তবে খামারিরা বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণে হরমোন ব্যবহারের যে অভিযোগ রয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই। অধিকাংশ খামারেই এখন প্রাকৃতিক খাদ্য ব্যবহার করেই পশু লালন-পালন করা হচ্ছে।

যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের শাহাবাটি গ্রামের খামারি আব্দুর রউফ বলেন, আমার খামারে এখন ৩৬টি উন্নত জাতের ষাঁড় রয়েছে। প্রতিটির ওজন ৫শ থেকে ৭শ কেজির মধ্যে হবে। সবুজ ঘাস, ভুট্টা ও গমের ভুসি খাইয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে।

তবে গত বছরের বাজার পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেষ সময়ে এসে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে কয়েকটি গরু বিক্রি করতে হয়েছিল। অনেকটাই লোকসান হয়েছে। হাটে ক্রেতা কম ছিল, আবার কিছু ব্যবসায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে বলেও অভিযোগ ছিল। এবার ভালো দাম পাব কি না, তা নিয়ে এখনও দুশ্চিন্তায় আছি।

একই উপজেলার কিসমত নওয়াপাড়া গ্রামের খামারি সাইফুল ইসলামও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, এবার ২০টি গরু প্রস্তুত করেছি। কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা চলছে। কিন্তু গত বছর শেষ সময়ে এসে অনেক খামারি বিপদে পড়েছিলেন। অনেক গরু অবিক্রিত থেকেছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করেছেন।

তার ভাষ্য, বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল। ছোট খামারিরা ন্যায্যমূল্য পায়নি। এবার সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা না হলে ক্ষুদ্র খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

খামারিরা জানান, গত কয়েক বছরে পশুখাদ্য, খড়, ভুসি, ভুট্টা ও ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেলেও বাজারে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যায় না।

এদিকে কুরবানির পশুর হাটগুলোতে নিরাপত্তা ও তদারকি জোরদারের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি পশুর হাটে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ক্রেতা ও বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে অস্থায়ী হাট বসানোর বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জেলার প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি টিম কাজ করবে। কোনো অসুস্থ পশু, পেটে বাচ্চাযুক্ত গাভী বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা পশু যাতে বাজারে বিক্রি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।

প্রসঙ্গত, একসময় যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুরবানির বাজার মূলত ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে ২০১৬ সালে ভারত সরকার গরু আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করার পর এ অঞ্চলে দেশীয় খামার গড়ে ওঠে ব্যাপকভাবে। বর্তমানে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে যশোরের খামারিরা দেশের বিভিন্ন জেলায় কুরবানির পশু সরবরাহ করছেন।