যশোরে বেতন বঞ্চিত ননএমপিও শিক্ষক কর্মচারীদের মানবেতর জীবনযাপন

0

আকরামুজ্জামান ॥ করোনা পরিস্থিতিতে যশোরে বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নন-এমপিও শিক-কর্মচারী প্রায় তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। হাতেগোনা কয়েকটি নামি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বেতন দিলেও বেশিরভাগ নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক-কর্মচারী বেতন পাননি। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠান শিার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় এসব শিক্ষকের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত ১৭ মার্চ থেকে যশোরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এরপর দফায় দফায় বন্ধের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ নির্দেশনায় আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত এ মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। জানা গেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিার্থীদের টিউশন ফি আদায়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে নন-এমপিও শিকদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে নন-এমপিও শিক্ষকদের কোনো আয় না থাকায় তারা চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোরের ৮ উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা মিলিয়ে ২৪৭ টি নন-এমপিও শিা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিা প্রতিষ্ঠানে ১৮ শ ৩০ জন শিক এবং ৩ শ ৬১ জন কর্মচারী রয়েছেন। নন-এমপিও শিা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা সরকার থেকে কোন বেতন পান না। শিার্থীদের দেওয়া বেতন থেকে শিকদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা চলে যা খুবই সামান্য। পাশাপাশি তারা টিউশনি করেই মূলত সংসার খরচ চালান। কিন্তু করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে অনেকে সংসার চালাতে অন্য পেশার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। যশোর সদর উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামের বি,এম,এস নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক বিরাম চন্দ্র বলেন, করোনার কারণে তাকে আজ পথে বসতে হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের তিন বেলা খাবার জুটাতে গিয়ে এখন অন্যের সংসারে কাজ করতে হচ্ছে। কখনো কারো তে খামারে ৩০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তিনি বলেন, সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে এ পথ বেছে নিতে হয়েছে। এভাবে যখন যে কাজ পাচ্ছেন তাই করছেন তিনি।
একই অবস্থা একই শিা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক গনেশ চন্দ্র সরকারের। তিনি জানালেন, সব শিকের প্রায় একই অবস্থা। গ্রামের স্কুল হওয়ায় শিার্থীদের কাছ থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে স্কুলের খরচ মিটিয়ে শিকদের হাতে তেমন কিছুই তিনি দিতে পারেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাপন খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এমনকি তার নিজেরও চলা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘শহরে কয়েকটা বাড়ি গিয়ে টিউশনি করতাম। সেই টাকা দিয়ে কোনরকমে সংসার চলতো। করোনার কারণে গত কয়েকমাস তাও বন্ধ। ধার দেনা করে সংসার চালাচ্ছি।
এ ব্যাপারে নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা শিকদের সংগঠন নন-এমপিও শিা প্রতিষ্ঠান শিক-কর্মচারী ফেডারেশনের যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান জানান, ‘করোনা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনযাপন। শিকরা এখন এতো মানবেতর জীবন যাপন করছেন যে তা প্রকাশ করা যায় না। তারা যে কি করছে তা জনসম্মুখে বলাও কষ্টকর। তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আমরা স্কুল থেকে যা সামান্য বেতন পেতাম তাও পাচ্ছি না। তিনি বলেন, এ অবস্থায় শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরাও একই সমস্যায় আছেন। তাদের কাছ থেকে বেতন আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই আমাদের মতো মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তাই আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি সংকটময় মুহূর্তে আমাদেরকে সরকারি সহযোগিতার আওতায় আনার জন্য।
এ বিষয়ে নন-এমপিও শিা প্রতিষ্ঠান শিক-কর্মচারী ফেডারেশনের যশোর জেলা শাখার সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘করোনাকালে সবচেয়ে করুণ অবস্থা আমাদের। আমরা কী করবো তা ভেবে পাচ্ছি না। নন-এমপিও শিকদের নগদ প্রণোদনা দেয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান তিনি।’ এদিকে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে জেলার অধিকাংশ নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি নেয়া থেকে বিরত থাকলেও যশোরের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বকেয়া বেতন ও পরীক্ষার ফি আদায়ের জন্য অভিভাবকেদর ওপর চাপ দিচ্ছে। শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ টাকা ফান্ড রয়েছে। তারা বিগত দুই মাস শিক্ষকদের বেতনও পরিশোধ করেছেন। অথচ গ্রামাঞ্চলের নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক-কর্মচারী গত তিন মাস ধরে বেতন থেকে বঞ্চিত হয়ে আসলেও করোনাকালে শিক্ষার্থীদের কাছে তারা আজও বেতন দাবি করেননি। শিক্ষকদের দাবি, এ অবস্থায় বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনা হোক।