যশোরে নাজুক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি

0
  • ২০দিনে ৬ খুন, বেড়েছে ডাকাতি,
  • মাদক ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরে একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছেন। চলতি মাসের ২০দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৬ জন খুনের শিকার হয়েছেন। তাছাড়া ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, তুচ্ছ ঘটনায় অহরহ ছুরিকাঘাত এবং যত্রতত্র মাদকের ব্যবসা বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মানুষ। ক্রমশ অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির পেছনে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যকে দায়ী করছেন অনেকে। কিন্তু পুলিশ তথা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ‘কচ্ছপ গতি’র তৎপরতায় বাড়ছে আতঙ্ক। অবশ্য পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা অপরাধী দমনে তৎপর রয়েছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসে প্রথম খুন হয় গত ৩ নভেম্বর যশোর শহরের খড়কি দক্ষিণ পাড়ায় চাঁচড়া-খয়েরতলা বাইপাস সড়কের পাশে। ওইদিন ভোররাতে চুরির উদ্দেশ্যে একটি বাড়িতে ঢোকার চেষ্টাকালে কতিপয় য্বুক আসাদুল নামে এক দুর্র্বৃত্তকে ধাওয়া করে তাকে মারধর এবং কুপিয়ে জখম করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেই তার মৃত্যু হয়। একইদিন রাতে তার আরেক ভাই সাগর অপরাধমূলক কর্মকা-ের উদ্দেশ্যে ভেকুটিয়া বাজার এলাকায়র ঘোরাফেরা করার সময় স্থানীয় লোকজন তাকে ধরে পিটুনি দেয়। আসাদুল ও সাগর দুই ভাইয়ের বাড়ি খড়কি দক্ষিণ পাড়ায়। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ৪ নভেম্বর রাতে খোলাডাঙ্গা সার গোডাউনের পেছনে সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্থানীয় গাজীর বাজারের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম সজল। এর কয়েকদিন পর গত ৯ নভেম্বর ঝিকরগাছা পৌর এলাকার পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে খুন হন পিয়াল হাসান নামে এক যুবক। তিনি একটি হত্যা চেষ্টা মামলার আসামি ছিলেন। ওই মামলায় জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরে আসার পর পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষরা ধাওয়া করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করেন। এ ঘটনার ৩ দিন পর গত ১২ নভেম্বর ঝিকরগাছা উপজেলার মাটিকুমরা দক্ষিণ পাড়ায় মাদকাসক্ত ফুফুর হাতে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হয় ৮ বছরের শিশু সাদিয়া। সোনার কানের দুল ছিনিয়ে নিতে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন ফুফু চম্পা। ঝিকরগাছায় হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৫ নভেম্বর রাতে যশোর শহরের ঢাকা রোড তালতলায় বাসের ভেতর ঘুমন্ত অবস্থায় নৃশংসভাবে খুন হন হেলপার বাপ্পি সরদার। পতিতার সাথে প্রেমের দ্বুন্দ্বের জের ধরে সহকর্মী ও বন্ধু রানা সরদার তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। পরদিন ১৬ নভেম্বর অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া রেলস্টেশন সংলগ্ন গরুহাটায় পূর্ব বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে গুরুতর জখম হন রবিউল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। পরদিন ভোরে খুলনা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সূত্র জানায়, শুধু খুন নয়, যশোরে ডাকাতি এবং চুরি, ছিনতাই অপহরণ করে চাঁদাবাজির ঘটনা আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি পেয়েছে। যা শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর সদর উপজেলার পাঁচবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদের বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতি হয়। ৭/৮ জনের একদল দুর্বৃত্ত তার বাড়িতে হানা দিয়ে পরিবারের লোকজনকে হাত-পা বেঁধে সাড়ে ৬ ভরি সোনার অলঙ্কারসহ ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এর আগেরদিন রাতেও ডাকাতেরা সদর উপজেলার সুজলপুরের মোকসেদ আলী নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে ডাকাতির চেষ্টা চালিয়েছিলো। পাঁচবাড়িয়ায় ডাকাতি এবং সুজলপুরে ডাকাতির চেষ্টার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৯ নভেম্বর গভীর রাতে যশোরের শেখহাটি বাবলাতলায় এসিআই কোম্পানির ডিপো অফিসে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা দুই জন প্রহরীকে বেঁধে রেখে ১৫ লাখ টাকা রক্ষিত লোহার সিন্দুক নিয়ে যায়।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, পুলিশের নিস্ক্রীয়তার সুযোগে যশোরে ফের উড়ন্ত ছিনতাইকারীরা মাথাচাড়া নিয়ে উঠেছে। গত ১৮ নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে উড়ন্ত ছিনতাইকারীরা সদর উপজেলার আরবপুর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সামনে উড়ন্ত ছিনতাইকারী চাকুর ভয় দেখিয়ে এক নবদম্পতির কাছ থেকে নগদ ১৫ হাজার টাকা এবং মালয়েশিয়ান ১ হাজার রিংগিত ছিনতাই করে নিয়ে যায়। শুধু উড়ন্ত ছিনতাইকারী নয়, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। নবদম্পতির কাছ থেকে ছিনতাইয়ের আগেরদিন গত ১৭ নভেম্বর বিকেলে দুর্বৃত্তরা যশোর পৌরপার্কের ভেতর থেকে রিয়ন হাসান নামে এক কলেজছাত্রকে অপহরণ করে চাঁদাদাবি করেছিলো তার পরিবারের কাছে। অবশ্য পরে পুলিশের অভিযানে ৩ চাঁদাবাজ আটক এবং অপহৃত কলেজছাত্রকে উদ্ধার করে পুলিশ।
একাধিক সূত্র জানায়, যশোর শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। শহরের রেলবাজারের পূর্বে হোটেল শাহীন ও হোটেল শাহানাজের গলিতে ভোরবেলায় এবং রেলস্টেশনের দক্ষিণে দ্বিতীয় প্লাটফর্মের পাশে ও রেলগেটে যাওয়ার রাস্তায় গভীর রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছে। জিলাস্কুলের সামনে ভোলাট্যাংক রোড মোড়সহ বিভিন্ন ক্রাইম স্পট গভীর রাতে ছিনতাইকারীদের দখলে চলে যায়। পুলিশ নিয়মিত টহল না থাকায় গভীর রাতে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, যশোর শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন অলিতে গলিতে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম ভয়াবহ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে যশোর শহরের ২টি ডোমপট্টিতে রমরমা মাদকের কারবার চলছে। রেলবাজারের পূর্বে হোটেল শাহানাজের গলিতেও বড় ধরনের মাদকের স্পট গড়ে উঠেছে। শুধু মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি নয়, নির্বিঘœ মাদক ব্যবসার কারণে মাদকসেবীদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। মাদক সেবনের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদকসেবীদের অধিকাংশই চুরি এবং ছিনতাইয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।
কয়েকদিন আগে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক-সার্কেল জুয়েল ইমরান একটি হত্যাকা-ের বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, পুলিশ আগের চেয়ে বেশি তৎপর হয়েছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে। একটি বাদে অন্য সকল হত্যার সাথে জড়িতদের আটক করতে পেরেছে পুলিশ।