যশোরে এক মণ্ডপে ১০১ প্রতিমা

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আসন্ন দুর্গোৎসব উপলক্ষে যশোরের চাঁচড়া বর্মনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে এক ছাদের নিচে সাজানো হয়েছে ১০১টি প্রতিমা। সনাতন ধর্মের সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলিযুগের নানা পৌরাণিক উপাখ্যান তুলে ধরা হয়েছে প্রতিমার মাধ্যমে। ধর্মীয় ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং অশুভ শক্তির বিনাশের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

মন্দিরজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবী ও পৌরাণিক চরিত্রের প্রতিমা। সরস্বতী, শিব, রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাম-সীতা, হনুমান, জগদ্ধাত্রী, কালী ও মনসার পাশাপাশি স্থান পেয়েছে কপূতা রাক্ষসী ও কুম্ভকর্ণের মতো পৌরাণিক চরিত্র। প্রতিটি প্রতিমায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কাহিনির নানা দিক।

নির্মাণশৈলী ও বৈচিত্র্য দেখতে প্রতিদিনই মন্দিরে ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।

আয়োজনটি বাস্তবায়নে প্রায় দুই মাস ধরে কাজ করেছেন মৃৎশিল্পীরা। প্রতিমার কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটির কাজ, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও রং করা—প্রতিটি ধাপেই ছিল তাদের নিরলস পরিশ্রম। অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও কোথাও কোথাও চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা। পৌরাণিক চরিত্রগুলোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীরা দিয়েছেন বিশেষ গুরুত্ব।

প্রতিমা দেখতে আসা শিপ্রা বর্মনের কাছে এবারের আয়োজন যেন দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের উপলক্ষ। তিনি বলেন, “আমরা প্রতি বছর অন্য এলাকায় যাই প্রতিমা দেখতে। এবার আমাদের গ্রামে এত সুন্দর একটা পূজা হচ্ছে, অনেক বড় আয়োজন। আমাদের অনেক দিনকার স্বপ্ন ছিল এটি। অনেক দিন আমাদের মনে আশা ছিল। ভগবান এবার আমাদের সেই আশাটা পূর্ণ করেছেন। তাই আমরা অনেক খুশি।”

একই আয়োজনকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ হিসেবে দেখছেন দীপাঙ্কর বর্মন। তার ভাষ্য, “আমাদের বর্মনপাড়াতে ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের চার যুগ তুলে ধরা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে হিন্দু ধর্মের যুগে যুগে পরিবর্তন এটা দেখে ভালো লাগছে এবং নতুন কিছু শিখতে পারছি।”

আয়োজকদের দাবি, প্রতিমা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শুধু ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া নয়, বরং চার যুগের পৌরাণিক কাহিনি ও নৈতিক শিক্ষাও তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে অশান্তির বিপরীতে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিতেই এই থিম নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান বর্মনপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মন।

তিনি বলেন, “সারা বিশ্বে যে একটা অশান্তি চলছে; আমরা শান্তির বার্তা দেওয়ার জন্য এই থিমটা তৈরি করেছি।

সনাতনীদের চারটি যুগ আছে; সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি, এই যুগ অনুসারে দুষ্টুদের দমন করার জন্য যুগে যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন, সেই ভাবটা আমরা এখানে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। অনেক দর্শনার্থী আসা শুরু করে দিয়েছেন। আশা করছি, এখানে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে।”

দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করতে পেরে সন্তুষ্ট শিল্পীরাও। প্রতিমাশিল্পী আকাশ মণ্ডল বলেন, “চার যুগের কাহিনিতে দুই মাস ধরে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছি। ইতোমধ্যে রঙের কাজও শেষের দিকে। রাতদিন কাজ করছি। কিছুটা সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। দর্শনার্থীরা দেখতে এসে যখন কাজের প্রশংসা করছে; তখন আনন্দ উদ্বেলিত করছে।”

ছবি: লোকসমাজ।

এদিকে শুধু চাঁচড়া বর্মনপাড়া নয়, শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে যশোর জেলার আট উপজেলাজুড়েই চলছে প্রস্তুতি। এবার জেলার ৭৪৩টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরেও প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। সেখানকার প্রতিমাশিল্পী শংকর মণ্ডল এবার তৈরি করছেন ৩৭টি প্রতিমা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তিনি।

পূজামণ্ডপের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উৎসবকে সুশৃঙ্খল ও সম্প্রীতিপূর্ণ রাখতে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ।

পূজা উদযাপন পরিষদ যশোরের সভাপতি দীপাঙ্কর দাস রতন জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ২৮টি বেশি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। উৎসব চলাকালে মণ্ডপগুলোতে ডিজের পরিবর্তে ভক্তিগীতি বাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি মন্দিরে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সম্প্রীতি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে। জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

ছবি: লোকসমাজ।

জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, “কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শঙ্কাহীন পরিবেশে যেন নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পৌরাণিক ইতিহাস, শিল্পকলা ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এবার দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি চলছে যশোরজুড়ে। এর মধ্যে চাঁচড়া বর্মনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরের ১০১ প্রতিমার আয়োজন পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। চার যুগের উপাখ্যানকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা এই উদ্যোগ দেখতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, উৎসবের এই আয়োজন ধর্মীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে দেবে।