যশোরের বড় বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৬ বছরে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের হাতে জিম্মি ছিলেন। এই ওয়ার্ডটি জেলার প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা ‘বড় বাজার’ হিসেবে পরিচিত।
যশোরের এই বড় বাজার এলাকায় বাঁধন গ্রুপ, সানি গ্রুপ, ডিশ বাবু গ্রুপ ও শিপলু গ্রুপের সন্ত্রাসীদের চুরি, ছিনতাই, অস্ত্র ও মাদকের ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিলো। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই আওয়ামী লীগের শেল্টারে থাকা এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের হোতাদের অধিকাংশ গা ঢাকা দিলেও সহযোগীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের আটকে এখনো পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, যশোর পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের লোন অফিস পাড়ায় সদর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে নড়াইল পুকুর পাড়ের প্রয়াত এক আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে ফারাজী আশিকুল ইসলাম বাঁধন। নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয়দানকারী বাঁধন একটি অপরাধী গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। উগ্র মেজাজি এবং অসভ্য হিসেবে চিহ্নিত বাঁধনের গ্রুপে রয়েছে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী। এরা হচ্ছে. বড় বাজারের তরকারি বাজার এলাকার আবুল কালামের ছেলে হৃদয়, সম্ভু দত্তের ছেলে বাবু দত্ত প্রমুখ। এর মধ্যে বাবু দত্ত চোরাই স্বর্ণ কারবারের সাথে জড়িত। হৃদয় একটি হত্যা মামলার আসামি। তাছাড়া হৃদয়সহ বাঁধন গ্রুপের অন্য সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে চুরি, ছিনতাই এবং ইয়াবা ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ব্যবসা করায় সাধারণ মানুষ শান্তিতে ছিলেন না। বাঁধনের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায়নি। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন স্কুল কেন্দ্রে ভোট ডাকাতিতে সহায়তা করেছিলেন বাঁধন নিজেই। এজন্য ভোটগ্রহণের দিন ওই কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে রেখেছিলেন। নির্বাচনের দিন যশোর-৩ আসনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ওই কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তার সাথে অশালীন আচরণ করেছিলেন বাঁধন।
সূত্র জানায়, পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ড এলাকায় আরেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নেতৃত্ব দেন গোলাম কিবরিয়া সানি নামে নব্য এক আইনজীবী। তিনি পূর্ব বারান্দী মোল্লাপাড়া ঢাকা রোড এলাকার ব্যাংকার আব্দুল আজিজের ছেলে। বাড়ি ১ নং ওয়ার্ডে হলেও তিনি ২ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম বারান্দী কদমতলা এলাকায় সন্ত্রাসীদের লালনের জন্য অফিস খুলে বসেছিলেন। তার সহযোগী সন্ত্রাসীদের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাধারণ মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিলো। সানি গ্রুপের কদমতলা এলাকার মিজানের ছেলে শান্ত, রবির ছেলে চায়না সাগর ও আবু জাফরের ছেলে আমিনসহ ৮/১০ জনের একদল চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিনতাই ও এবং ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা ছাড়াও বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসীদের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হতে দেখা গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে মোল্লাপাড়া ঢাকা রোডে নিজ বাড়ির গলিতে মোটরসাইকেল রাখা নিয়ে দ্বন্দ্বে সানির নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা মুকুল নামে একজন ব্যবসায়ীকে মারধর করেছিলো। ওই সময় ব্যবসায়ী মুকুল নিজ লাইসেন্সকৃত রিভলবার দিয়ে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন।
এলাকাবাসী জানান, ২ নং ওয়ার্ডের আর এন রোড মসজিদ গলি এলাকায় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুলের শেল্টারে থেকে আওয়ামী লীগের শাসন আমলে নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালিয়ে এসেছে কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। এরা হচ্ছে, আব্দুর রহমানের ছেলে রুবেল ওরফে কানা রুবেল, ফকরুলের ছেলে অভি এবং খোকন বাবুর্চির ছেলে বাবু ড্রাইভার। এর মধ্যে কানা রুবেল অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। ভারত থেকে চোরাই পথে অবৈধ অস্ত্র এনে সে বিভিন্ন অপরাধীদের কাছে বিক্রি করে থাকে বলে এলাকাবাসী দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, চুড়িপট্টির বাসিন্দা স্যাটেলাইট কেবল ব্যবসায়ী মীর মোশারফ হোসেন ওরফে ডিশ বাবু জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের কাছের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকার মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা ছাড়াও চিহ্নিত কয়েকজন সন্ত্রাসীকে পুষতেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের দালাল হিসেবেও কাজ করতেন। ডিশ বাবুর পোষ্য সন্ত্রাসীরা হচ্ছে, চুড়িপট্টির দিলশাদের ছেলে শেখ হোসেন রাব্বি, আজাদের দুই ছেলে এসকে হাসান রকি ও সাজ্জাদ হোসেন অ্যানি, দুলালের ছেলে শিমুল, আসলামের ছেলে রাকিব ও রনির ছেলে ছোট হৃদয়। এর মধ্যে ছোট হৃদয় বেজপাড়ার ইমরান হত্যা মামলার আসামি। কয়েক বছর আগে ছোট হৃদয়ের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা বড় বাজার মাছ বাজারের কাছে ইমরানকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছিলো। এছাড়া ডিশ বাবু গ্রুপের সন্ত্রাসীরা মাছ বাজার এলাকায় মাদকের ব্যবসার সাথে জড়িত। ওই এলাকার এক ব্যক্তির একটি বাড়ি দখল করে তারা সেখানে নিয়মিত মাদক সেবনের আসর বসিয়ে থাকে। সূত্র জানায়, ডিশ বাবুর হয়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী মোটা পলাশ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
২ নং ওয়ার্ডের এইচ এম এম রোডের একটি সূত্র জানায়, পুরাতন কসবার বাসিন্দা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শাহাজাহান কবীর শিপলুর বড় বাজার এলাকায় একটি অপরাধী গ্রুপ রয়েছে। ওই রোডে দিনের বেলায় ভ্যানে করে অথবা বিয়ারিংয়ের গাড়িতে করে বেশ কয়েকজন যুবক বিভিন্ন প্রকার ক্ষুদ্র মালামাল বিক্রি করে থাকে। এই যুবককের অধিকাংশ মাদকের ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের সাথে জড়িত। এরা শিপলুর গ্রুপের লোক হিসেবে পরিচিত। গভীর রাতে এরা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। রাতে এরা মদ ও ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা করে থাকে।
এছাড়া ২ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম বারান্দী নাথপাড়ায় সুব্রত দেবনাথের ছেলে সংগ্রাম, আব্দুল জব্বারের ছেলে সুজন, গৌতম দেবনাথের ছেলে গগন, মোহাম্মদ বিশ্বাসের ছেলে রুবেল, অসীম সাহার ছেলে আকাশ, চুড়িপট্টির আব্দুল্লাহ আল সানি, লোন অফিস পাড়া আদর্শ স্কুল পাড়ার আবু জাফর চৌধুরীর ছেলে ওসামানুজ্জামান চৌধুরী, এইচ এম রোডের নুর ইসলামের ছেলে জনি, খালধার রোড নিকারী পাড়ার টুটুলের ছেলে ইফাদ, লিয়াকতের ছেলে আবু জাফর ও মদন সাহার ছেলে স্বচ্ছ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং মাদকের ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চালিয়ে এসেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।