মালিকদের চাপে ভাড়া পরিশোধ করে মেস ছাড়লেন অসহায় শিক্ষার্থীরা

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবার পর মেস মালিকদের অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছেন যশোর শহরের লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। চাপের মুখে তারা বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করে মেস ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ভাড়া মওকুফের নির্দেশনা অনেকেই মানছেন না।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি এমএম কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি সিটি কলেজ, সরকারি যশোর কলেজ, সরকারি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, বিসিএমসি প্রকৌশলী মহাবিদ্যালয়, ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী মেসে থাকেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শহর থেকে বাড়ি অনেক দূরে হওয়া তারা মেসে থেকে লেখাপড়া করেন। যশোর ছাড়াও আশপাশের অনেক জেলার শিক্ষার্থী রয়েছেন। যশোর শহরে মেস রয়েছে এক হাজারেরও অধিক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই মেস বা লেখাপড়ার খরচ চালায় টিউশনির পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খন্ডকালীন কাজ করার মধ্য দিয়ে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না থাকায় শহরে এসে তাদের মেস ও লেখাপড়ার খরচ যোগাতে হয়। কিন্তু গত ৮ মার্চ করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই থমকে যায় তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। ওই মাসের মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যায় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। পাশাপাশি লকডাউন হওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যায় তাদের খন্ডকালীন কর্মের ক্ষেত্রটিও। এমতাবস্থায় টিউশনি ও খন্ডকালীন কর্ম হারিয়ে তারা মেস ছেড়ে বাড়ি চলে যান। এরপর থেকে মেস মালিকরা তাদের ওপর বিভিন্ন চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। মেস মালিকরা ওই সকল শিক্ষার্থীদের মোবাইলে ভাড়া পরিশোধের পাশাপাশি জায়গা খালি করে দিতে জোর তাগিদ দেন। প্রথম অবস্থায় অনেকেই মালিকদের চাপ সহ্য করতে না পেরে লকডাউনের মধ্যেও ভাড়া পরিশোধের পাশাপাশি জায়গা খালি করে দেন। বিষয়টি অনেক অমানবিক হওয়ায় এই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তারা অনেক কর্মসূচিও পালন করেন। এমন পরিস্থিতিতে ৩০ এপ্রিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন নিজেই মেস মালিকদের প্রতি ভাড়া মওকুফের আহ্বান জানান। একই দাবি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদেরও। এমন পরিস্থিতিতে গত ৪ মে সার্কিট হাউজে মেস মালিক ও সাংবাদিকসহ শহরের বিশিষ্ট জনদের নিয়ে একটি সভা করেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। সভায় জেলা প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা মেস মালিকদের প্রতি শতকরা ৬০ ভাগ ভাড়া মওকুফ এবং পহেলা এপ্রিল থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না খোলা পর্যন্ত ভাড়া নেয়ার আহ্বান জানান। সে সময় মালিকরা ওই আহ্বান একমত পোষণ করলেও পরে তা দ্বিমত পোষণ করেন। যে কারণে ৩০ মে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান আবারও একই স্থানে মেস মালিকদের নিয়ে সভা করেন। সেই সভায় শতকরা ২৫ ভাগ ভাড়া মওকুফের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপরও মালিকরা তড়িঘড়ি করে শিক্ষার্থীদের ভাড়া পরিশোধ করার জোর তাগিদ দেন। পাশাপাশি জায়গা খালি করে দিতেও চাপ সৃষ্টি করেন। তাদের জায়গা খালি করে দেয়ার আগেই মালিকরা টু লেট এবং ফ্যামিলি বা বাসা ভাড়া দেয়া হবে এমন লেখা সম্বলিত সাবলেট সাটিয়ে দিয়েছেন। মালিক পক্ষের এই চাপে অনেকেই রেড ও ইয়োলো জোনের মধ্য থেকে এসে ভাড়া পরিশোধের পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মালিকদের জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। গতকাল সোমবার এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় বেনাপোল থেকে আসা যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সবুজ হোসেনের সাথে। তিনি খড়কি আপন মোড় এলাকায় একটি মেসে থাকেন। মোবাইলে মালিকদের চাপ সহ্য করতে না পেরে সবুজ হোসেন ভাড়া পরিশোধ করে বাড়ি চলে গেছেন। একই কথা বলেন মনিরামপুর থেকে আসা সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী জাকির হোসেন। তাদের মত অধিকাংশ শিক্ষার্থী মালিকদের সৃষ্ট অমানবিক আচরণে ভাড়া পরিশোধ করে বাড়ি ফিরছেন। তবে সবচেয়ে বিপদে ছাত্রীরা কারণ তারা একই অবস্থার মধ্যে বাড়ি থেকে একা আসতে পারছেন না। যে কারণে বড় বা ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে এসে জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এমন অবস্থার মধ্যে তাদের পাশ থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাননি বিভিন্ন ছাত্র সংসংগঠনের নেতারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয় ছাত্রদলের জেলা শাখার অধিনস্থ কয়েকটি শাখার নেতারা আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভাড়া মওকুফের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। তাদের দাবি, সরকারি প্রণোদনা দিয়ে হলেও যেন এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভাড়া মওকুফ করা হয়। বামপন্থী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন একই দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান বলেন, মেস মাকিদের যথেষ্ট মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা মানবিক না হলে কি আর করা। যেহেতু আইনগত কোন সিদ্ধান্ত না। তবে মেস মালিকরা শিক্ষার্থীদেরকে হয়রানি করছেন এমন বিষয় তার জানা নেই।