মনিরামপুরে বিচারবহির্ভূত বিএনপির ১১ নেতা-কর্মী হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি আটক নেই

0

মজনুর রহমান,মনিরামপুর(যশোর)॥ বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির ১১ নেতা-কর্মীর স্বজনরা স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আদালতে সাতটি মামলা করেছেন। স্বজনদের অভিযোগ,এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি।
জানা যায়, উপজেলার ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের জয়পুর গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে বিএনপি কর্মী আনিচুর রহমানকে ২০১৩ সালের ২২ মার্চ সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সহায়তায় পুলিশ বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। ওই রাতেই পাশর্^বর্তী নাজমুল হোসেনের মুদি দোকানের পাশে আনিচুরকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। নিহতের ভাই মুনছুর আলী জানান, এ হত্যাকান্ডের পর পুলিশের চাপে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে তারা ওই সময় কোনো মামলা করতে পারেননি।
২০১৩ সালের ১৩ জুন আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে মাছনা গ্রামের যুবদল কর্মী হাফিজুর রহমান এবং ২২ নভেম্বর আমিনপুর গ্রামের আশিকুর রহমানকে। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে নিহত হন বিপ্রোকোনা গ্রামের মতিয়ার রহমান, ২১ ফেব্রুয়ারি চাপাকোনা গ্রামের জয়নাল আবেদিনকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে।
২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হন পৌর শহরের তাহেরপুর গ্রামের ইফসুফ আলী এবং দুর্গাপুর গ্রামের লিটন হোসেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর জয়পুর(গুপের বাজার) বাজারে পল্লী চিকিৎসক বিএনপি নেতা বজলুর রহমানের ওষুধের দোকানে বসে গল্প করছিলেন আবু সাঈদ। অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন ওসি মোল্যা খবির আহমেদের নেতৃত্বে জয়পুর গ্রামের বাবর আলী গাজীর ছেলে বিএনপি কর্মী আবু সাঈদকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রাতেই আটক করা হয় একই গ্রামের বাবর আলীর ছেলে পল্লী চিকিৎসক বজলুর রহমানকে। আটকের পর আবু সাঈদের স্ত্রী পারভীনা খাতুন ও বজলুর রহমানের স্ত্রী রেশমা খাতুন থানা হাজতে তাদের সাথে সাক্ষাত করেন। কিন্তু ভোররাতে আবু সাঈদ ও বজলুকে বেগারীতলা বাজারের উত্তরপাশে কথিত ক্রসফায়ারের নামে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে।
১৯ মার্চ নিহত হন খেদাপাড়া ইউপি সদস্য যুবদল নেতা কাশিপুর গ্রামের মেজবাহ উদ্দিন চন্টু। নিহতের ভাই আলি হোসেন জানান, তার ভাই চন্টুর বিরুদ্ধে কয়েকটি রাজনৈতিক মামলা থাকায় তিনি ঢাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সহায়তায় ১৯ মার্চ ঢাকা থেকে ওসি খবির মোল্যা, এসআই তাসমিমসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা চন্টুকে আটক করে যশোর ডিপি পুলিশের অফিসে নিয়ে আসেন। ওই রাতেই স্থানীয় গরীবপুর গ্রামের জুয়েল, সেলিম, নুরুন্নবিসহ আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাকর্মী পুলিশের সাথে যোগসাজশে যুবদল নেতা চন্টুকে কুপিয়ে হত্যা করে। পরদিন সকালে যশোর মর্গে চন্টুর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর রাতে উপজেলার লাউড়ী গ্রামে যুবদল নেতা আনিছুর রহমানের বাড়িতে আওয়ামী লীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। আনিছুরের ভাই মফিজুর রহমান জানান, রাতে সন্ত্রাসীরা বাড়িঘর ভাঙচুরের পর আনিছুরকে ধরে হাত-পা ভেঙে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথের জামাই মনিরামপুর থানার তৎকালীন ওসি বিপ্লব কুমার নাথ ওই রাতেই কথিত ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করে আনিছুরকে। পরদিন ৩ নভেম্বর সকালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসাপাতালের মর্গে আনিছুরের মরদেহ পাওয়া যায়।
চলতি বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর নিহতদের স্বজনরা আদালতে মোট সাতটি(চন্টু, আনিচ, সাঈদ, বজলু, আনিছুর, লিটন ও ইফসুফ) মামলা করেন। নিহত আবু সাঈদের স্ত্রী পারভীনা খাতুন এবং বজলুর রহমানের স্ত্রী রেশমা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে আদালতে মামলা করা হলেও আজও আসামিদের বিরুদ্ধে থানা মামলা রেকর্ড করেনি। যুবদল নেতা নিহত আনিছুর রহমানের ভাই মামলার বাদী মফিজুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশে থানা পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে মামলাটি রেকর্ড করলেও এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করেনি। একই অভিযোগ করেন চন্টু হত্যা মামলার বাদী আলী হোসেন। আলী হোসেনের অভিযোগ এজাহারভুক্ত কাউকে গ্রেফতার না করে পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে কয়েকজনকে আটক করেছে।
মনিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি)এবিএম মেহেদী মাসুদ জানান, আদালতের নির্দেশে এ পর্যন্ত আনিছুর রহমান ও মেজবাহ উদ্দিন চন্টু হত্যা মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে ছয় জনকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।