ভবদহের মানুষেরা ভোগান্তি নিরসনের দাবি নিয়ে জেলা সদরে

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে অবস্থান ও স্মারকলিপি পেশ

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আবারও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল জেলা সদরে এসে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দীর্ঘ সময়ের অবস্থান করেন ভবদহ দুর্গত এলাকার শ শ মানুষ। জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ৪ দফা ভিত্তিতে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন তারা। এসময় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

সোমবার দুপুর ১২টায় ভবদহ অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিরা পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হন এবং দুপুর ২টা পর্যন্ত গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

দুপুর ২টার দিকে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অধ্যাপক অনিল বিশ্বাস ও উপদেষ্টা তসলিম উর রহমান-এর নেতৃত্বে পানিবন্দী নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন এবং তা দ্রুত মন্ত্রীর কাছে পাঠানোর আশ্বাস দেন। এ সময় আমডাঙ্গা খালের সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি ১ লাখ টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেন।

এর আগে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে স্মারকলিপিটি পাঠ করে শোনান।

গণঅবস্থান কর্মসূচিতে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তসলিম উর রহমান, অধ্যক্ষ শাহীন ইকবাল, অ্যাডভোকেট হামিদ আমিনুর রহমান হিরু, শাহাজান আলী, আনোয়ার আলম দুলু, রিয়াদ হোসেন, দীপক পাড়ে, রাজু আহমেদ, মাসুদ কাজনা, আজিজুর রহমান, শিবপদ, বাসন্তী রানী প্রমুখ।

২ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই গণঅবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা পানিসম্পদ মন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যশোর জেলার মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর এবং খুলনা জেলার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার শতাধিক গ্রামের বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও ফসলের জমি পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই পানির উচ্চতা এবং প্লাবনভূমি বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে ওই এলাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

বক্তারা নদীতে পলি খননের পাশাপাশি টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) কর্মসূচি চালু রাখার জোর দাবি জানান। তারা উল্লেখ করেন, বিগত ৪৫ বছর ধরে কৃত্রিমভাবে এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আসছে। এই জনপদের মানুষের উদ্ভাবিত নদী, পলি ও পানি ব্যবস্থাপনার ‘অষ্টমাসী বাঁধ’ প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে ষাটের দশকে আরোপিত ‘কর্ডন পলিসি’ প্রয়োগ করার ফলেই আজকের এই দশা। এর ফলে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও তা শুধু অপচয়ই হয়নি, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস এবং জনপদের স্থায়ী বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

সংগ্রামের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সরেজমিনে পরিদর্শন করে তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ১. জনগণের মতামতের ভিত্তিতে টিআরএম চালু করা, ২. আমডাঙ্গা খাল প্রশস্ত করে সংস্কার করা, এবং ৩. হরি নদীসহ সংশ্লিষ্ট নদী ও খাল খনন করা।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে জনগণের ভোগান্তি আরও বেড়েছে এবং সমস্যাটি জটিল রূপ নিয়েছে। অভয়নগর উপজেলায় আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কার্যাদেশ প্রদান করা হলেও দুই বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নানা অজুহাতে সংস্কারকাজ রহস্যজনকভাবে আটকে আছে। অথচ এই খাল দিয়ে শতকরা ২৫ ভাগ পানি নিষ্কাশন সম্ভব।

১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দে ৮১.৫ কিলোমিটার হরি ও ভদ্রা নদী খননের কাজ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শুরু হলেও তা এখনও শেষ হয়নি। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর নদী খননের সময় খর্ণিয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বাঁধ দেওয়া হয়। সেই বাঁধ থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার নদী পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে খর্ণিয়া বাঁধসহ সকল আঁড়বাঁধ খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে করা হয়নি। ফলে ভরাটকৃত পলি অপসারণ না করায় এবার প্লাবনভূমি ব্যাপক এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। দ্রুত আঁড়বাঁধসমূহ তুলে দিয়ে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার পলি অপসারণ করা জরুরি। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী সে কাজ শুরু করেছে।

স্মারকলিপিতে বক্তারা আরও বলেন, বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল, নদীতে যে পরিমাণ পলি আসে, তাতে নদী খনন ও টিআরএম যুগপৎভাবে না করা হলে খননের ১৪০ কোটি টাকা পুরোটাই অপচয় হবে; আজ সেটাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৯৮ সালের পর থেকে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সকল সমীক্ষায় বিলে বিলে টিআরএম-এর মাধ্যমে ৪০-৫০ বছর নদী ও পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘকালীন সমাধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ১৬ মে ২০২৬ তারিখে যশোর শিল্পকলা একাডেমিতে একটি জাতীয় কর্মশালার আয়োজন করে। উক্ত কর্মশালায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এলাকার সংসদ সদস্যবৃন্দ, অববাহিকা আন্দোলনকারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে, যেখানে ৯৭ শতাংশ মানুষ টিআরএম প্রকল্পের পক্ষে জরিপ রিপোর্ট দেন। উপস্থিত প্রতিনিধিরা প্রস্তাবের সাথে মৌলিকভাবে একমত পোষণ করেন এবং নদী খননের সাথে সাথে প্রস্তাবিত বিলে টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়নের মতামত দেন।

বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে অহেতুক দীর্ঘসূত্রিতা বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় ডেকে আনছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় কুচক্রী মহল এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায় না। নিজেদের পকেট ভারী করার লক্ষ্যে তারা বারবার টিআরএম-এর সিদ্ধান্ত বানচাল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ছবি: লোকসমাজ।

বক্তারা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, একাধিকবারের সাবেক মন্ত্রী সর্বজন শ্রদ্ধেয় মরহুম তরিকুল ইসলামকে স্মরণ করে বলেন, ২০০৬ সালে টিআরএম বিরোধী চক্রের ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে তৎকালীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম পূর্ব বিল খুকশিয়ায় টিআরএম চালু করেন। এর ফলে ২০১২ সাল পর্যন্ত এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত ছিল এবং নদী গভীর ও প্রশস্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিল কালিয়ায় টিআরএম করতে গেলে আওয়ামী লীগ নেতা ও ঠিকাদার স্বপন ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা সংগঠিত হয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালিয়ে টিআরএম বন্ধ করে দেয়। তারা দীর্ঘদিন মানুষকে পানিবন্দী রেখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অর্থ লুটপাট করেছে, যা আজকের এই ভয়াবহ দুর্যোগের অন্যতম প্রধান কারণ।

এ অবস্থায় দুর্গত এলাকায় মন্ত্রীর দ্রুত সরাসরি হস্তক্ষেপ, সরেজমিনে পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৪ দফা দাবি জানানো হয়:

১. আই ডব্লিউ এম’র চলমান সমীক্ষায় যশোরের জাতীয় কর্মশালায় উত্থাপিত প্রতিটি বিলে পর্যায়ক্রমে সামগ্রিক সংস্কার প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন, নদী খনন এবং প্রকল্প কার্যকর করা।

২.
জরুরিভিত্তিতে আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা, যাতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশিত হতে পারে। একই সাথে সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রিতার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।

৩.
অবিলম্ব খর্ণিয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশের আঁড়বাঁধসহ সকল আঁড়বাঁধ অপসারণ করা এবং খর্ণিয়া থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত দ্রুত পলি অপসারণ করা।

৪.
পানিবন্দী মানুষের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।