বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক অভিষেকের নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনিয়া

0
বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কেপ ভার্দে স্পেনের বিপক্ষে ড্র করেছে ।। ছবি: সংগৃহীত

আটলান্টা স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজতে না বাজতেই সব ক্যামেরা ঘুরে গেল একটি মানুষের দিকে। ৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার গাল বেয়ে তখন অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। গ্যালারিতে হাজার হাজার নীল পোশাকের সমর্থক একে অপরকে জড়িয়ে ধরে নাচছেন। মাঠে খেলোয়াড়রা ছুটে আসছেন একজনের দিকে। নিরপেক্ষ দর্শকরাও মেতে উঠেছেন উৎসবে।

কারণটা সহজ — বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে — তাদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই।

৭ সেভ, একটি রেকর্ড, একটি ইতিহাস

ম্যাচজুড়ে কেপ ভার্দে মূলত নিজেদের ১৮ গজ বক্সের মধ্যে রক্ষণ সামলেছে। স্পেনের একের পর এক আক্রমণের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন ভোজিনিয়া, মোট ৭টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেছেন। বিশ্বকাপের এক ম্যাচে এর চেয়ে বেশি সেভ করেছেন কেবল একজন — প্যাট জেনিংস, যিনি ১৯৮৬ সালে নিজের ৪১তম জন্মদিনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের হয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে ১০টি সেভ করেছিলেন।

েকর্ডও গড়েছেন ভোজিনিয়া। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে কোনো দেশের হয়ে বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ডটি এখন তাঁর। একই বিশ্বকাপে এর আগের দিনই কুরাসাওয়ের এলোয় রুম গড়া রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে অভিষেকের সময় কেবল মিশরের এসাম এল হাদারিই ছিলেন তাঁর চেয়ে বয়স্ক।

পুরস্কাহিসেবে উঠেছে ম্যাচসেরার ট্রফিও।

৪০ বছর ১২ দিন বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অভিষেক ম্যাচ খেলা বয়োজেষ্ঠ্য খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড গড়ার ম্যাচে স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডদের আক্রমণ নসাৎ করছেন ভোজিনিয়া।। ছবি: সংগৃহীত

মা আসতে পারেননি, দাদা-দাদি নেই — তবু ভোজিনিয়া কাঁদলেন আনন্দে

ুরস্কার নেওয়ার পর ভোজিনিয়া বললেন, “আমি কেঁদেছিলাম, কারণ আমি আমার দাদা-দাদির সাথে বড় হয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত তারা এখানে ছিলেন না। তারা কয়েক বছর আগেই মারা গেছেন। তারা আমার কাছে সবকিছু ছিলেন।”

“আর আমার মায়ের জন্যও। ভিসার কারণে তিনি এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে টাকা দিতে হয়, তার জন্য আমরা সময়মতো আসতে পারিনি। আমি চেয়েছিলাম তিনি এখানে থাকুন।”

এরপরেই যোগ করলেন, “এ পারফরম্যান্স সবার জন্যই। আমি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছি, কিন্তু এ পুরস্কারটি আমার সকল সতীর্থদের জন্য।”

২৫ বছর বয়সে পেশাদার শুরু, দীর্ঘ যাত্রার শেষে বিশ্বকাপ

জোসিমার দিয়াস নামে জন্ম নেওয়া এই গোলরক্ষকের গল্পটা সহজ ছিল না। কেপ ভার্দের মিন্ডেলো দ্বীপে বড় হওয়ার সময় ভালো খেললেও উচ্চতা কম থাকায় দলে সুযোগ মিলত না। অবশেষে সুযোগের খোঁজে পর্তুগালে পাড়ি জমান। কিন্তু পেশাদার ফুটবল শুরু করেন ২৫ বছর বয়সে — যা সে পর্যায়ে ‘অনেক দেরি’ হিসেবেই বিবেচিত।

এরপর স্লোভাকিয়া, অ্যাঙ্গোলা, মলদোভা, সাইপ্রাস হয়ে ঘুরে এখন পর্তুগালের দ্বিতীয় সারির ক্লাব চাভেসে খেলেন। তিনি বলেন, “আমি জাতীয় দল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম, কিন্তু এই স্বপ্নের জন্য আমি খেলা চালিয়ে গেছি।”

তাঁর নামের সঙ্গেও ফুটবলের ইতিহাস জড়িয়ে। বাবা চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনা ও রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তি হোর্হে ভালদানোর নামে তাঁর নাম রাখতে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজি হয়নি। শেষে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে খ্যাতি পাওয়া ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের নামে রাখা হয় ‘জোসিমার’। কয়েক দশক পরে আরেকটি বিশ্বকাপে সেই জোসিমারই নিজের ইতিহাস লিখলেন।

৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ ফলোয়ার এক রাতে

মাঠের বাইরেও ভোজিনিয়া রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যান। ব্রাজিলে বিশ্বকাপের স্বত্ব থাকা ইউটিউব চ্যানেল কেজটিভি দর্শকদের তাঁকে অনুসরণ করতে বললে ইনস্টাগ্রামে এক রাতেই ফলোয়ারের সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিষয়টা জেনে ভোজিনিয়া বলেন, “এটা অবিশ্বাস্য।”

বিশেষজ্ঞদের চোখে রাতটা কেপ ভার্দের

স্কটল্যান্ডের প্রাক্তন উইঙ্গার প্যাট নেভিন বলেন, “তিনি এই খেলাটিকে আলোকিত করেছেন। তিনি ৪০ বছর বয়সে এটা করেছেন। প্রত্যেকটি ক্যামেরা তাঁর দিকে তাক করা। এ এক অসাধারণ মুহূর্ত।”

আইটিভিতে লি ডিক্সন বলেন, “এই পয়েন্টটা তাদের প্রাপ্য ছিল এবং স্পেনের তো এক পয়েন্টও পাওয়ার কথা না। রাতটা কেপ ভার্দের।”

শেফিল্ডেচেয়ে বড় নয় এমন একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র সেদিন রাতে ফুটবলবিশ্বের কল্পনা জয় করে নিয়েছিল।