বাগেরহাটে পানের দরপতনে ক্ষতিগ্রস্থ চাষি

0

বাগেরহাট সংবাদদাতা॥ অসময়ে বৃষ্টি, ছত্রাকজনিত নানা রোগ, কুয়াশা ও তীব্র শীতে পান পেকে যাওয়া, সার কীটনাশক, মজুরিসহ নানা উপকরণের দাম বৃদ্ধিসহ কারণে বাগেরহাটে পানের দরপতনসহ নানা কারনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পান চাষিরা। জেলার সবচেয়ে বড় পানেরহাট ফকিরহাট উপজেলার টাউন নোয়াপাড়া। শীতে সাধারণত পানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা সারা বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এ সময় অপেক্ষা করেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া ও বিদেশে পান রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় এবছর পানের দামে ধ্বস নেমেছে। বর্তমানে ৮০টি (পোন) পান মাত্র ৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ফকিরহাটের টাউন নোয়াপাড়া পাইকারী বাজারে বড় আকারের পানের পোন ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এবার মাত্র ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পানের দাম গত বছরের তুলনায় অর্ধেকের চেয়েও কমে গেছে। অথচ খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। বর্তমানে আকার ভেদে প্রতি পোন পানের ৩০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া শীতে পেকে যাওয়ায় বড় সাইজের পান ১০টাকা ও মাঝারী আকারের পান ৫ টাকা দরে প্রতি পোন বিক্রি হচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারী এ পানের বাজারে সপ্তাহে রবি ও বৃহস্পতি বার ২ দিন মধ্যরাতে হাট বসে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকার এখান থেকে এসে সারা রাত পান কিনে সকালে ট্রাক, পিকআপ ও বাস যোগে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান।


টাউন নোয়াপাড়া পানের বাজারের ইজারাদার মোশারেফ হোসেন ওরফে মোশা মেম্বার জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে পান রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় পাইকারদের পান কেনার চাহিদা কমে গেছে। খারাপ আবহাওয়ায় বরজে পান নষ্ট হওয়ায় চাষীরা দ্রুত পান কেটে বাজারে নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে পাইকার কম থাকায় ও যোগান বেশি হওয়ায় দাম কমে গিয়েছে। রোব বার হাটে পান বিক্রি করতে আসা নগেন দাশ, শান্তি বাড়ৈ, রমজান শেখ, রবিউল ফকিরসহ কয়েকজন পান চাষীর সাথে কথা হয়। তাঁরা জানান, কিছু দিন আগে সমূদ্রে নিম্নচাপে অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাতা পচা রোগ, রাইজোকটোনিয়া সোলানি ছত্রাকের আক্রমণে রুট রোট রোগ হচ্ছে বরজে। এছাড়া শীতের দাপটে পাতা পেকে যাওয়া ছাড়াও হলুদ দাগ রোগ, পাতা শুকিয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন রোগে পান আক্রান্ত হচ্ছে। ফলে প্রতিকারের জন্য সার ও ওষুধে তাদের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। সার, ওষুধ, বরজের ছন, উলু, শলা-কাঠিসহ সব জিনিসের দাম বেড়েছে। অথচ গতবছরের তুলনায় পানের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। নোয়াপাড়া গ্রামের পান চাষী শেখ শওকত আলী ও লখপুর এলাকার সুশান্ত দাস জানান, বরজের মাচা তৈরির জন্য গত বছর ছনের প্রতি শ’ আটি কিনেছি ৯০০ টাকায় যা এবার ১ হাজার ৪০০ টাকা। শলার দাম আটিতে ৫০ টাকা, উলু ও খাসিয়ার দাম ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। এছাড়া বরজে কিষাণীর মজুরী গত বছরের তুলনায় দুই থেকে তিনশত টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।


কৃষি অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় প্রায় সাড়ে ৫০০ হেক্টর জমিতে আড়াই হাজারের অধিক ছোট-বড় পানের বরজ আছে। পান চাষে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে প্রায় ২০ হাজার লোক জড়িত। উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রায় সব ওয়ার্ডে বানিজ্যিকভাবে পানের চাষ হয়ে থাকে। পান দ্রুত পচনশীল দ্রব্য হওয়ায় কৃষকেরা এটি সংরক্ষণ করতে পারছেন না। দাম কম হলেও বাধ্য হয়ে কৃষকরা পান বিক্রি করছেন। ফলে ক্ষতির মূখে পড়ছেন তাঁরা। ফকিরহাট বাজারের সরকারি বিসিআইসি সার ডিলার ও মেসার্স আল শাহীন ট্রেডার্সের পরিচালক মো. শাহীন আলম জানান, সরকারের দেওয়া সারের দাম না বাড়লেও পান চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সরিষা ও তিলের খৈলের ৭০ কেজির বস্তা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া জিপসাম, ম্যাগনেসিয়াম সালফার, রোটন পাউডার, হিউমিক জৈব, ইমেডা ক্লোরোফিড ও জৈব সারের দাম অবস্থান ভেদে ৫ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে চাষীদের পান উৎপাদ খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু দাম কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। তিনি আরও জানান, তার দোকান থেকে অনেক চাষী বাকীতে সার ওষুধ কিনলেও ক্ষতির মূখে দেনা শোধ করতে পারছেন না। অনেক চাষী এনজিও ও ব্যাংক থেকে টাকা ঋণ নিয়ে পান চাষ করে বিপদে পড়েছেন। দাম কম হওয়ায় কিস্তির টাকাও জোগাড় করতে পারছেন না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাছরুল মিল্লাত বলেন, পান চাষীরা বহুমূখী সংকটে রয়েছেন। বাজারে পানের ভালো দাম পেলে তাঁরা বৈরী আবহাওয়াজনিত বরজের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারতো। এই সংকটে পান চাষীদের নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।