যশোর পোস্ট অফিসের দুই কোটি টাকা আত্মসাত মামলা দুদকের চার্জশিট নিয়ে প্রশ্ন

0

মীর মঈন হোসেন মুসা ॥ যশোর প্রধান ডাকঘরের সাবেক পোস্টমাস্টার আব্দুল বাকীর স্ত্রী ফারহানা আফরোজের কোন আয়ের উৎস না থাকলেও তার নামে ডাকঘরেই এফডি (ফিক্সড ডিপোজিট) আছে ২ লাখ টাকা। যশোর প্রধান ডাকঘরের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক পোস্টমাস্টার আব্দুল বাকীকে অভিযুক্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চার্জশিট দিলেও রেহায় পেয়েছেন তার স্ত্রী। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অংকের টাকা লেনদেন হওয়ায় ফারহানা আফরোজকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়নি।
দুদক সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সাবেক পোস্টমাস্টার আব্দুল বাকীর স্ত্রী ফারহানা আফরোজ একজন গৃহিনী। তিনি স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। আব্দুল বাকী ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ডাকঘরের সঞ্চয় ব্যাংকের ১৭ জন গ্রাহকের পাশবই ব্যবহার করে সরকারি ১ কোটি ৭৮ লাখ ৫ হাজার টাকা উত্তোলনপূর্বক আত্মসাৎ করেন। এই টাকার মধ্যে তিনি নিজ নামে ব্র্যাক ব্যাংক যশোর শাখায় ৬৩ হাজার ৬১৫ টাকা ৫৯ পয়সা ও ৮টি এফডিআরে ৪ লাখ টাকা এবং স্ত্রী ফারহানা আফরোজের নামে প্রধান ডাকঘরে ২ লাখ টাকা এফডি করে রেখেছিলেন। যা দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে। ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বলা হয়েছে, কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ অন্য কারোর কাছে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেন তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও অভিযুক্ত হবেন। আব্দুল বাকী নিজ স্ত্রী ফারহানা আফরোজের নামে যে টাকা এফডি করে রেখেছেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ভাষায় সেটা রূপান্তর। সেক্ষেত্রে ফারহানা আফরোজও একই মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অভিযুক্ত হবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, নিজ স্ত্রীকে মামলা থেকে রক্ষা করতে কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় আব্দুল বাকী বিভিন্ন মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তা দুদক যশোরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক (বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে উপ-পরিচালক,বাগেরহাট) মোহা. মোশাররফ হোসেনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। এ জন্য ৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও প্রচার রয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ফারহানা আফরোজকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়নি। এছাড়া উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার সুবিধার্থে আব্দুল বাকী তদন্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ রাখেন। এ কারণে ধার্য্যদিনের দুই দিন পর যশোরের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরই সুযোগ নিয়ে মামলার সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন করেন এবং জামিন পেয়ে যান আব্দুল বাকী।
সাবেক পোস্টমাস্টার আব্দুল বাকীর উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন দুদকের পিপি অ্যাড. মো. সিরাজুল ইসলাম।
আব্দুল বাকীর স্ত্রী ফারহানা আফরোজকে চার্জশিটে অভিযুক্ত না করা প্রসঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা মোহা. মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, আসামি আব্দুল বাকী নিজেই স্ত্রীর নামে থাকা অর্থের দায় কাঁধে নেওয়ায় তাকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হয়নি। চার্জশিটে অভিযুক্ত না করতে ৭ লাখ টাকা লেনদেনে হয়েছে এমন প্রচার সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে হেসে উঠে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, আপনি কার কাছ থেকে এসব কথা শুনেছেন। চার্জশিট তো আপনি দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে সবকিছুর দায় তো আপনার ওপর বর্তায় এমন কথা বলা হলে তিনি বলেন, আপনি দুদক যশোরের ডিডি’র কাছে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন।
দুদক যশোরের উপ-পরিচালক মো. আল আমিন বলেন, যেহেতু মোহা. মোশাররফ হোসেন তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন সে কারণে তিনিই সবকিছু বলতে পারবেন। তারপরও যদি চার্জশিটে কোনো অসঙ্গতি থাকে এবং এ বিষয়ে আদালত যদি কোনো নির্দেশনা দেন সেই অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ২২ অক্টোবর প্রায় ২ কোটি আত্মসাতের মামলায় সাবেক পোস্টমাস্টার আব্দুল বাকী এবং তাকে সহযোগিতার অভিযোগে আরও দুই জন যশোর প্রধান ডাকঘরের সাবেক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুদ্রাক্ষরিক বর্তমানে খুলনার ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের কার্যালয়ে সংযুক্ত মো. আক্কাছ শিকদার ও যশোর নৈশ ডাকঘরের সাব পোস্টমাস্টার শেখ করিমুল্লাহর বিরুদ্ধে সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা মোহা. মোশাররফ হোসেন। গত ১৯ নভেম্বর একই আদালতে চার্জশিটের ওপর শুনানি শেষে গ্রহণ করা হয়।