পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে মৌসুমি পেশায়: ঈদের আগে বাড়তি আয়ের খোঁজে ঢাকায় হাজারো শ্রমজীবী

0
ছুরি-বঁটি ধার দেওয়ার কাজ খুঁজছেন দুই বন্ধু ইমদাদুল ও নাজমুল।। ছবি: প্রথম আলো

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় প্রতিবছরের মতো এবারও ভিড় জমিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষ। কেউ এসেছেন ছুরি-বঁটি ধার দিতে, কেউ পশুর খাবার বেচতে, কেউবা কোরবানির মাংস রাখার চাটাই ও খাইট্টা নিয়ে রাস্তার পাশে বসেছেন। এঁরা কেউই পেশাদার ব্যবসায়ী নন। ঈদের এই কয়েকটা দিনে বাড়তি কিছু আয়ের আশায় সাময়িকভাবে পেশা বদলে নেন তাঁরা।

হবিগঞ্জ থেকে ঢাকায় দুই বন্ধু

সোমবার দুপুরে রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায় দেখা মেলে ইমদাদুল (১৮) ও নাজমুলের (১৯)। দুজনের বাড়িই হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায়। পেশায় রাজমিস্ত্রির সহযোগী এই দুই বন্ধু ছুরি-বঁটি ধার করার যন্ত্র কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। দুজনেরই বাবা মারা গেছেন। কম বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁদের।

কয়েক বছর আগে নির্মাণকাজের পাশাপাশি শিখেছেন ছুরি-বঁটি-দা ধার দেওয়ার কাজ। তখন থেকেই প্রতিবার কোরবানির ঈদের আগে এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। ইমদাদুলের ভাষায়, ‘প্রতিবার ঢাকাত আয়ি, কয়ডা বেশি পয়সা যদি অয়।’

দা-বঁটি-ছুরি ধার করানোর মজুরি ভিন্ন ভিন্ন। ছুরি ধার করতে সর্বনিম্ন ২০ টাকা, আর বড় সাইজের বঁটিতে লাগে দেড় শ টাকা পর্যন্ত। তবে পণ্যের অবস্থা খারাপ থাকলে খরচ আরও বাড়ে।

এবার অবশ্য হতাশ নাজমুল। এক সপ্তাহ ধরে ধানমন্ডি, বাসাবো, মতিঝিল, ওয়ারী ও আজিমপুর এলাকা ঘুরেছেন তাঁরা, কিন্তু কাজ তেমন মেলেনি। বৃষ্টির কারণে গত দুই দিন এক বেলা করে বেরোতেও পারেননি। ঢাকায় আসা-যাওয়া এবং থাকা-খাওয়ার খরচ কম নয়। কাজ ভালো না পেলে খালি হাতেই ফিরতে হবে। তবে দুশ্চিন্তা সরিয়ে রেখেছেন নাজমুল। বলেন, ‘বড় বিষয় হইছে ভাইগ্যো। মালিকে (আল্লাহ) যদি কাজ দেয়, ঠিকমতো কাজ করতা পারি। তাইলে অইব।’

পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে ঘাস-খড় বেচছেন আলী হোসেন

বিকেলে কারওয়ান বাজারে দেখা হয় ষাটোর্ধ্ব কাঠমিস্ত্রি আলী হোসেনের সঙ্গে। নোয়াখালীর গ্রামে তাঁর দুই মেয়ে, এক ছেলে ও স্ত্রী। পুরো সংসারের ভার তাঁর একার কাঁধে। কাঠের কাজ কমে যাওয়ায় আয় কমেছে। তার ওপর মাথায় রয়েছে ঋণের বোঝা। ঈদের আগে বাড়তি কিছু উপার্জনের আশায় কয়েক দিন ধরে ঘাস, খড় ও ভুসি বিক্রি করছেন তিনি।

বললেন, ‘পোলা-মাইয়াদের তো ঈদের সময় মাছ-মাংস কিইনা খাওয়াইতে হইব।’ ঈদের আগের রাতে গ্রামে ফিরবেন আলী হোসেন। আশা করছেন, তার আগেই মালামাল সব বিক্রি হয়ে যাবে। তাঁর হিসাব, দুই-তিন দিনে হয়তো দুই-চার হাজার টাকা থাকবে হাতে।

বিশ বছর ধরে একই কাজ, গত বছর লস — তবু আশা ছাড়েননি নুরনবী

আলী হোসেনের পাশেই চাটাই আর খাইট্টা নিয়ে বসেছেন নুরনবী। বেশির ভাগ সময় ফল বেচেন তিনি। কিন্তু ঈদের আগের কয়েক দিন বসেন এই মৌসুমি ব্যবসায়। প্রায় ২০ বছর ধরে কারওয়ান বাজারে এই একই কাজ করছেন। চাটাই বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ২২০ টাকায়, আর তেঁতুলগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি খাইট্টা বিক্রি হচ্ছে আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। তবে এবার তেঁতুল কাঠের দাম বেশি হওয়ায় গাব ও বরই কাঠের খাইট্টা বেশি এনেছেন।

গত বছর প্রায় বিশ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে তাঁর। এ বছর আবার নেমেছেন একই আশায়। বললেন, ‘গ্যাছে বছর ধরা খাইছি।…এবারে আল্লায় দিলে হইব।’

ঈদের আনন্দের পেছনে এভাবেই নিরবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এঁরা। কেউ হতাশ, কেউ আশাবাদী — কিন্তু প্রত্যেকের চোখেই একটাই স্বপ্ন, ঈদের আগে পরিবারের কাছে কিছুটা বেশি নিয়ে ফেরা।