পদ্মাসেতু রেললিংকের যশোর অংশের দুর্নীতি তদন্তে চিঠি

0

সাইফুর রহমান সাইফ ॥ যশোরে কোন কোন স্থানে নতুন রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে তা জানতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি এসেছে সংশ্লিষ্ট দফতরে। সম্প্রতি এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকার নতুন রেলপথ ও স্টেশন নির্মাণের নামে প্রচুর অর্থ আত্মসাত করে। সে বিষয়টি জানতে এ চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন যশোরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রফিকুল হাসান। দৈনিক লোকসমাজকে তিনি বলেন, আমিও চিঠি দেখেছি। তবে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া পদ্মসেতু রেললিংক প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলপথ নির্মাণ করা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় রেলপথটির নির্মাণ ব্যয় ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, যা ৪ হাজার ৫৭৪ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। পিপিপি হিসেবে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯০৭ মিলিয়ন ডলারে। এ হিসেবে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে এক কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করতে খরচ হয় ৭৬ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলার, এ হিসেব প্রাথমিক। পরে আরও কিছু কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রেলপথের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে করা হয় ১৭২ কিলোমিটার। তবে অতিরিক্ত রেলপথ নির্মাণে কত ব্যয় হয়েছে তা জানা যায়নি। এ রেলপথে মোট স্টেশন ২০টি। যার মধ্যে ১৪টি নতুন করে নির্মাণ হয়। এগুলো হলো -কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা, শিবচর, ভাঙ্গা, নাগরকান্দা, মুকসুদপুর, মহেশপুর, লোহাগড়া, নড়াইল, পদ্মবিলা ও জামদিয়া। বাকি ছয়টি স্টেশন পুনর্বিন্যাস করা হয়। এ স্টেশনগুলোর ভেতর আছে রূপদিয়া ও সিঙ্গিয়া স্টেশন।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, চীনের সবগুলো রেলপথ মোটামুটি ১৫০ থেকে গতি আরম্ভ হয়। তাদের পাহাড়ি এলাকাও বেশি থাকে। সে হিসেবে আমাদের ব্যয় অনেক বেশি। তাছাড়া আমাদের নির্মাণের পদ্ধতিগত ত্রুটিও আছে। আমরা ফিজিবিলিটি স্টাডিকে যেনতেনভাবে করে, সাপোর্ট প্রজেক্ট না করে কাজে নেমে গিয়ে খরচ দ্বিগুণ করে ফেলি।

এদিকে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের সাবেক ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা প্রমথ রঞ্জন ঘটকসহ ২৩ জনকে আসামি করে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের বিরুদ্ধে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে সরকারি খাস জমি, অর্পিত সম্পত্তি ও অন্যান্য মালিকানাধীন সম্পত্তির ভুয়া রেকর্ড তৈরির মাধ্যমে ৯ কোটি ৯৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

বুধবার (৫ মার্চ) দুদকের মাদারীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। বুধবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন জানান, ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত দরপত্রের অন্যতম দরদাতা এসএনসি লাভালিন ইন্টারন্যাশনালকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করায় বনানী থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পরে তদন্ত শেষে ২০১৪ সালে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করা হয়। ওই মামলা পুনঃপর্যালোচনা করে কমিশন মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্যে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত নেয়।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে থাকা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, তখন জমিগুলো কেনার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিনতে হয়েছে সাবেক চিফ হুইপ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাইয়ের ছেলে নূরে আলম চৌধুরীর (লিটন চৌধুরী নামে পরিচিত) কৌশল ও চাপে। তখন আন্দোলন করে জমি কিনতে বাধ্য করা হয়।

সূত্র জানিয়েছে, পদ্মাসেতু রেললিংকে যশোর অংশেও দুর্নীতি হয়েছে। তদন্ত করলে তা বেরিয়ে আসবে। হিসেব চাওয়া এ তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়।