দুদকের ফাঁদে যশোরে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, লক্ষাধিক টাকা উদ্ধার

শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ভিন্নমত

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘুষের ১ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমকে আটক করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার বিকেলে নিজ কার্যালয় থেকে তাকে আটক করা হয়।

এদিকে, আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী দুদক কার্যালয়ের সামনে ভিড় করেন। তারা এসময় দাবি করেন, এ ঘটনায় যিনি অভিযোগকারী তিনি বিভিন্ন সময়ে সমালোচিত, কিন্তু শিক্ষা কর্মকর্তার এ বিষয়ে তারা সন্দিহান।

অভিযানকালে দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয় যশোরের উপ-পরিচালক মো. সালাউদ্দিন ও সহকারী পরিচালক মো. আল আমীন উপস্থিত ছিলেন।

দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমীন জানান,“আজ (বুধবার) নুরুন্নবী নামে এক জন ব্যক্তি আমাদের অফিসে এসে অভিযোগ করেন- তার স্ত্রী বেশ কিছু দিন আগে মারা যান। তার স্ত্রী বেতন ও পেনশন সংক্রান্ত কাগজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। একইভাবে তার এক বন্ধু সম্প্রতি মারা গেছেন, তার পেনশন সংক্রান্ত কাগজও আটকে রাখা হয়। এ ব্যাপারে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন।”

“ওই ব্যক্তি আরও অভিযোগ করেন এর আগে তিনি ওই কর্মকর্তাকে একাধিকবার ঘুষ দিয়েছেন। এরপরে তিনি (প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা) বলেছেন, আমাদেরকে আরও টাকা দিতে হবে। এভাবে সর্বশেষ বলা হয় তাকে আরও এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা দিতে হবে। এরপরে নুরুন্নবী অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য এ টাকা খুব কষ্ট করে যোগাড় করেছেন এবং দুদক অফিসে যোগাযোগ করেছেন। এরপর আমরা দুদক প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করে।

এরপর আমরা একটা ট্রাপ কাজ পরিচালনা করি। এই ট্রাপটা করার জন্য আমরা ওই কার্যালয়ে ওৎপেতে ছিলাম। এরপর যখন অভিযোগকারী নুরুন্নবী এক লাখ বিশ হাজার টাকা নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে দেন, উনি নিয়ে উনার ড্রয়ারে রেখে দেন। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের টিম গিয়ে তাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে।”
অভিযোগকারী নুরুন্নবী যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া খান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

তিনি জানান, তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার ঝিকরগাছা উপজেলার কাউরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর তার স্ত্রী মারা যান। স্ত্রী শিরিনা আক্তার মারা যাওয়ায় তার পেনশন সংক্রান্ত টাকা পাওয়ার জন্য তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু ৩ মাস ধরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাকে নানাভাবে ঘুরাচ্ছেন। তিনি হয়রানি করছিলেন। এক পর্যায়ে জেলা প্রাথমিক অফিসার ঘুষ দাবি করায় তিনি তাকে ৮০ হাজার টাকা দেন। এরপরও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আরো ঘুষ দাবি করেন।

তিনি অপরাগতা প্রকাশ করলে তাকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়, টাকা না দিলে তার স্ত্রী শিরিন আক্তারের পেনশনের টাকা ছাড় করা হবে না। এছাড়া একই দফতরের খুলনা বিভাগীয় একজন কর্মকর্তার সাথে যোগসাজসে তার স্ত্রীর মুল বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরো জানান, স্ত্রীর পেনশনের টাকা ছাড় করাতে এক পর্যায়ে তিনি ঘুষের টাকা দিতে রাজী হন। বুধবার বিকেলে তিনি ফাইল ছাড় করানোর জন্য দাবিকৃত ঘুষের ১ লাখ ২০ টাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমের অফিসে গিয়ে তার হাতে তুলে দেন। এ সময় গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দুদক কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে ঘুষের ১ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ হাতেনাতে আটক করেন।

এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমকে ঘুষের টাকাসহ আটকের খবর পেয়ে সন্ধ্যায় শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দুদক অফিস ঘেরাও করেন। তাদের দাবি, আশরাফুল আলম সৎ অফিসার। তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ওলিয়ার রহমান জানান, তার জানা মতে আশরাফুল আলম একজন সৎ মানুষ। তিনি ঘুষ নিয়েছেন এটা বিশ্বাস করেন না।

পুরাতন কসবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সোনিয়া লাইজু জানান, তাদের স্যার একজন ভালো মানুষ। যিনি তার বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ করেছেন সেই শিক্ষক নুরুন্নবী খারাপ প্রকৃতির। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।

সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী শিমুল হোসেন জানান, তার স্যার ভালো মানুষ। শুনেছেন স্যারের ড্রয়ারে টাকা পাওয়া গেছে। তবে তাকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলার দত্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আব্দুল জব্বার জানান, স্যার ভালো মানুষ। স্যারকে ছেড়ে না দিলে কঠোর আন্দোলনে যাবেন।

গতকাল রাতে দুদক যশোরের উপ-পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন জানান, যারা তার মুক্তি দাবি করছেন তাদের ৩ জন প্রতিনিধি এসেছিলেন। তিনি তাদেরকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে ওই অফিসারকে ঘুষের টাকাসহ আটক করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। প্রতিনিধিরা তার কথা শুনেছেন এবং ফিরে গেছেন।

দুদক অফিস থেকে বেরিয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন নামে একজন শিক্ষক উপস্থিত সকলকে জানান, দুদক কর্মকর্তা তাদেরকে জানিয়েছেন ওই অফিসারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমরা সকলেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা তার সম্পর্কে শুনেছি। বিষয়টি আমরা মানবিক দিক থেকে দেখব।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে সর্বশেষ খবরে জানা যায়, শিক্ষা কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলামকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।