সংসদ দুই টায়ারের যান, একটা ফুটো হলে অন্যটা চলবে না: বাজেট আলোচনায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান

0
জাতীয় সংসদকে সরকারি ও বিরোধী দলের 'দুই টায়ারে' চলা যানের সঙ্গে তুলনা করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে তিনি তোষামোদের রাজনীতি পরিহার, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের সিন্ডিকেট ভাঙার তাগিদ দেন।। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদকে সরকারি ও বিরোধী দল—এই দুই ‘টায়ারের’ ওপর চলা একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলকে দুর্বল করার চেষ্টা না করে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের সংসদীয় তোষামোদ, ব্যক্তিপূজা ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) সকালে স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা তাঁর সমাপনী বক্তব্যে এই আহ্বান জানান।

বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংসদেরও দুইটা টায়ার। একটা সরকারি দল, আরেকটা বিরোধী দল। যেকোনো একটা টায়ার অকেজো হয়ে গেলে যান চলবে না। এক টায়ারে আপনি পিন লাগাবেন, পেরেক মারবেন, তাহলে কিন্তু ওই টায়ারটা ফুটো হয়ে যাবে। ওইটা ফুটো হয়ে গেলে ওই টায়ার চলবে না।’
বিরোধী দলকে দুর্বল করার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা চমৎকার টেন্ডেন্সি আমরা লক্ষ করছি, প্রায় সকলেই কুচি কুচি করে কাটার পরে বলেন, এগুলা ছাড়েন, আমাদের সঙ্গে চলে আসেন। আমরা ওই কুচি কুচি করার জন্য আসি নাই।’ বিরোধীদলীয় নেতা স্পষ্ট করেন, এর অর্থ এই নয় যে সরকারি দল যা চাইবে বিরোধী দল সেটাই সমর্থন করবে, আবার বিরোধিতার খাতিরে সবকিছুর বিরোধিতাও করা উচিত নয়।

জামায়াতের আমির অতীতের সংসদীয় চর্চার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘অতীতের সংসদে দায়িত্বরত ব্যক্তিকে তোষামোদ করার জন্য গান হয়েছে, কবিতা হয়েছে, স্বপ্নবিলাস হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকা খরচ করে এই সংসদে এটা দেওয়া উচিত নয়। এটা তোষামোদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব পালনের জায়গা।’ তিনি স্পিকারের প্রতি সংসদের চরিত্রহননের মতো ‘ব্যাড কালচার’কে ‘না’ বলার আহ্বান জানান।

বাজেট প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শফিকুর রহমান কওমি মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ, ইবতেদায়ি মাদ্রাসা ও দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তি দ্রুত নিশ্চিত করার দাবি জানান। উচ্চশিক্ষা নিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা না গেলে দেশ চিরজীবন আমদানিনির্ভরই থেকে যাবে।

স্বাস্থ্য খাতের প্রসঙ্গে তিনি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর এবং সরকারি-বেসরকারি উভয় প্রতিষ্ঠানে সমভাবে তদারকি নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, ওই পাচারকৃত অর্থের নয় ভাগের এক ভাগও যদি আগামী অর্থবছরে ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে আমাদের কোনো বাজেট–ঘাটতি থাকবে না।’

তিনি সম্পদের পাশাপাশি অপরাধীদেরও দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের চাপ কমিয়ে কেবল একটি ট্যাক্স নির্ধারণের প্রস্তাব দেন।

প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় যেখানে ৮৫ হাজার টাকায় যাওয়ার কথা, সেখানে সিন্ডিকেটের কারণে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৬–৭ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছে; এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখাকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি তিনি অতীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেন। বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন বা চার মাস অন্তর অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপন এবং অর্থবছর জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, ভোলা সেতু নির্মাণ এবং প্রধান নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সহযোগিতায় নেওয়া মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নামের কাঙাল নই, আমরা কাজের কাঙাল। কাজটাই দেখতে চাই।’