জীবনাবসান জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতার

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ প্রেস ক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিনিধি মিজানুর রহমান তোতা ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল শনিবার সকাল সাতটার দিকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধী অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণের পাশাপাশি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
যশোরের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতার মৃত্যুতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
শনিবার বাদজোহর যশোর নতুন খয়েরতলা জামে মসজিদের সামনে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার সহধর্মিণী সাংবাদিক রেবা রহমানের কবরের পাশে মিজানুর রহমান তোতাকে দাফন করা হয়। জানাজায় রাজনৈতিক, সামাজিক পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছাড়াও নানা শ্রেণিপেশার বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
এর আগে মরহুমের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন যশোরের সাংবাদিক, রাজনৈতিকমহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। এ সময় প্রেস ক্লাব যশোর, যশোর জেলা সংবাদপত্র পরিষদ, যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন, সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর, যশোর জেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ফটো জার্নালিস্ট যশোর জেলা শাখা, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিসহ (মার্কসবাদী) বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে গত মাসের শেষ সপ্তাহে সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই তিনি বাসায় চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন। বাসায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনার উপসর্গ থাকায় তাঁর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারে পাঠানো হয়। ফলাফল নেগেটিভ আসে। এর কয়েকদিনের মাথায় দ্বিতীয় বারের মতো তাঁর মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়। এরপর ৩ জুলাই তাঁকে বেসরকারি কুইন্স হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানকার ডাক্তাররা তাকে কোভিড-১৯ রোগী বলে শনাক্ত করেন। পরীক্ষায় দেখা যায় তাঁর ফুসফুসের প্রায় ৬৫ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন তিনি।
তার ফুসফুসের এ পরিস্থিতি দেখে চিকিৎসকরা সাথে সাথেই তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের করোনা রেড জোনে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হয়। শেষ দিকে তাঁর করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল। একপর্যায়ে ঘণ্টায় দুই-তিন লিটার অক্সিজেন চলছিল তার শরীরে। কিন্তু করোনা রেড জোন থেকে বের করে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় শনিবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতির এক পর্যায়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
১৯৫৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ শহরের ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন পৌর এলাকাধীন চরমুরারীদহে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মিজানুর রহমান তোতা। তার পিতা জয়নাল আবেদিন ও মা মহিরণ নেছা দুজনেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি যশোর শহরের নতুন খয়েরতলা শহীদ মসিউর সড়কের নিজ বাসায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
মিজানুর রহমান তোতা ৪৫ বছর সাংবাদিকতা করেছেন। এর মধ্যে একটানা ৩৫ বছরই তিনি কাজ করেছেন দৈনিক ইনকিলাবে। যশোর সংবাদপত্র জগতে বিচরণ করে অবিভক্ত যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, একবার প্রেস ক্লাব যশোরের সম্পাদক ও তিনবার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন বিএফইউজের নির্বাহী কমিটির সদস্যও ছিলেন একবার। এর পাশাপাশি যশোর ইনস্টিটিউট, শিল্পকলা একাডেমি, অনির্বাণ লাইব্রেরির জীবন সদস্য, যশোর সাহিত্য পরিষদের সহসভাপতি ও জাতীয় কবি পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৭ সাল থেকেই ছড়া, কবিতা, সংবাদ লেখালেখিতে প্রবেশ তার। ১৯৭৮ সালে দৈনিক গণকন্ঠের রিপোর্টার, সমাচারের স্টাফ রিপোর্টার, ১৯৭৯ সালে যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফুলিঙ্গের স্টাফ রিপোর্টার,পরবর্তীতে দৈনিক স্ফুলিঙ্গের নিউজ এডিটর, দৈনিক ঠিকানায় এক্সিকিউটিভ এডিটর, দৈনিক আজাদের স্টাফ রিপোর্টার ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এর মধ্যে সাপ্তাহিক ছুটি, সাপ্তাহিক পূর্ণিমায় খন্ডকালীন লেখালেখি, তারপর থেকেই দৈনিক ইনকিলাবে একটানা ৩৫ বছরই তিনি কাজ করছেন।
সাংবাদিকতার ওপর তাঁর ‘মাঠ সাংবাদিকতা’ এবং আত্মজৈবনিক ‘ক্ষতবিক্ষত বিবেক’ নামের গ্রন্থ দুটি ইতঃপূর্বে খুবই সমাদৃত হয়েছে। প্রথিতযশা এই সাংবাদিক সাহিত্যচর্চা করেন বহুদিন। তাঁর অসংখ্য কবিতা দেশে-বিদেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার নির্বাচিত ৮০টি কবিতা নিয়ে ‘দিবানিশি স্বপ্নের খেলা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ হয়েছে। কাব্যগ্রন্থে অসাধারণ প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় সমাজের নানা বিষয় তুলে আনেন তিনি। কয়েক বছর আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার শরীরের একাংশ অকেজোপ্রায় হয়ে যায়। এর পর তিনি আর পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। সাংবাদিকতায় ছুটাছুটিও থেমে যায় অনেকটাই। এই সময়কালে তিনি কবিতা লেখালেখিতে মনোযোগী হন।
তার স্ত্রী রেবা রহমানও সাংবাদিকতার পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। স্বামীর পাশাপাশি তিনিও ইনকিলাবের যশোর জেলা সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। ২০১৯ সালে ৪ আগস্ট কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। এরপর থেকেই মিজানুর রহমান তোতা এক ছেলে, যমজ দুই মেয়েসহ নাতি-নাতনিদের নিয়ে জীবন কাটাতে থাকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ পরবর্তীতে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে সবাইকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন তিনি। তার মৃত্যুতে প্রেস ক্লাব যশোরের সাংবাদিকরা কালোব্যাজ ধারণ করেন। প্রেস ক্লাবে শোক বই খোলাসহ উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিজানুর রহমান তোতার জীবনাবসানে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন যশোরসহ আশেপাশের জেলা ও উপজেলার সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বিবৃতিদাতারা হচ্ছেন প্রেসক্লাব যশোরের সাবেক সভাপতি দৈনিক দেশহিতৈষীর সম্পাদক নুরুল আলম, যশোর সদর উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল, চৌগাছা প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিয়াউর রহমান রিন্টু ও সাধারণ স¤পাদক প্রভাষক অমেদুল ইসলামসহ সকল সদস্য, -নওয়াপাড়া প্রেস ক্লাবের উপদেষ্টা এসএম ফারুক আহমেদ ও আবিদ হাসান, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নজরুল ইসলাম মল্লিক, সাধারণ সম্পাদক মোজাফ্ফার আহমেদসহ সকল সদস্য, ঝিনাইদহের দৈনিক নবচিত্র পত্রিকার প্রকাশক আলহাজ শহিদুল ইসলাম, সম্পাদক আলাউদ্দীন আজাদ, বার্তা প্রধান আসিফ কাজল ও দৈনিক ঝিনাইদহ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক অধ্যক্ষ আমিনুর রহমান টুকু, ঝিনাইদহ প্রেসক্লাবের সভাপতি এম রায়হান, সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান টিপু, জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মিজানুর রহমান বাবুল ও সাধারণ সম্পাদক শেখ সেলিম প্রমুখ, বিবর্তন যশোর, যুব মৈত্রী যশোর শাখার সভাপতি অনুপ কুমার পিন্টু, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ ডলার,ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এনডিপির চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্তজা এবং মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা।