চেতনায় অমর একুশে

0

মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ॥ ‘ তোমার মুখের দিকে আমি সব সময় তাকিয়ে আছি।/যখন জেগে থাকি তখন তোমার দিকে স্থির করে রাখি দুটি চোখ। স্থির করে রাখি অস্তিত্ব।’ বাংলা ভাষা এমনই। কবি হুমায়ুন আজাদের মতই তার প্রতি গভীর মমত্ববোধ জাগে আমাদেরও। তবু আফসোসটা থেকেই যায় এর ব্যবহারে। দৈনন্দিন জীবনে আমরা যত না যতœ করে ভিন দেশের ভাষা ব্যবহার করি। আমরা সেভাবে বাংলাকে-নিজের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করি না। দাঁত থাকতে আসলে দাঁতের মর্যাদা বুঝতে পারি না। প্রকৃত কথা হলো বাংলা বানান শিখতে হবে যতœ নিয়ে। এই শহরে ব্যানার, পোস্টার, সাইনবোর্ডে আমাদের ভুল বানান খুঁজতে বেগ পেতে হয় না। এদিক-সেদিক তাকালেই বাংলা বানানের দুর্দশা চোখে পড়বে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সে ভুলের বাহার এখন আরও প্রকট। ভুল এবং দুর্বোধ্য শব্দের ছড়াছড়ি সেখানে। একবার ঢাকায় আমি গাড়িতে ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম। যেখানটাতে গেলাম সেই জায়গার নামটা সাইন বোর্ডে কয়েকটা বানানে শোভা পাচ্ছে। কেউ লিখেছেন প্রগতি স্মরণি, কেউ লিখেছেন প্রগতি স্মরণী, আবার কারোর সাইনবোর্ডে শোভা পাচ্ছে প্রগতি শরণি। তাহলে কোনটা সঠিক? আসলে শুদ্ধ বানান হলো সরণি। এর অর্থ সড়ক। অর্থাৎ হবে-প্রগতি সরণি। আমি সেদিন কোথাও এই শুদ্ধ বানানটি দেখিনি। শহরের যেকোনো রাস্তা ধরে হাঁটলে অন্তত কোনো না কোনো ভুল বানানের সাইনবোর্ড, পোস্টার বা লেখা চোখে পড়বেই।
যানবাহনগুলোর পেছনে নানান ধরনের উপদেশমূলক বাণী লেখা থাকে। প্রায়ই চোখে পড়ে ভুল বানানের উপদেশ। ছোট-বড় দোকানেও কম যায় না ভুল বানানের বাহারে। বানান বা ভুল বাক্য লেখা সম্পর্কে একজন ভাষা বিশেষজ্ঞ বলেন, না জেনে বানান ভুল লেখা সামান্য হলেও সেখানে আপত্তি থাকবে। কারণ, এটা নিজের ভাষা যতœ করে না শেখার ফল। তিনি বলেন, ‘ইংরেজি ভাষার বানান ভুল হলে আমরা লজ্জিত হই বা আরেকজন হাসবে বা ভর্ৎসনা করবে, এই ভয়ে আমরা তটস্থ থাকি। খুবই যতœ করে ইংরেজিটা শিখি। কিন্তু নিজের মাতৃভাষা বলে বাংলাকে অবহেলা করে শিখি, যতœ নিয়ে শিখি না। যার ফলে বানানে, ভাষায় বা বাক্যবিন্যাস সম্পর্কে আমাদের অযতেœর ছাপ থাকে।’ যতœ নিয়ে নিজের ভাষা শেখার দরকার আছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বানান ও ভাষার বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হবে। ভাষার মাসে বা সারা বছর এই বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের শিক বলেন, ‘বানান অবশ্যই শুদ্ধ করে বলতে এবং লিখতে পারা উচিত। বানান ভুল হয় অজ্ঞতা থেকে। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখার েেত্র ফোনেটিক ব্যবহার হয়। এতেও বানান ভুল হয়। এ জন্য প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটাতে হবে।’ ভাষাকে ভালোবাসতে হবে। এ জন্য শিাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা ও বানানের প্রতি জোর দিতে হবে। বানান চর্চার জন্য শিার গোড়ায় আমাদের হাত দেওয়া দরকার। ভাষা শিার ভিত তৈরি হয় বিদ্যালয়ে। স্কুলগুলো হয়তো বানানগুলোর ব্যাপারে যতœশীল না। চারিপাশে আমরা যা দেখি, ভাষাসম্পর্কিত যেসব বিষয় আছে সেসব বিষয় ছাড়া বা অন্য বিষয়ে বানানের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সব জায়গায় যেহেতু বাংলাকে এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিকদের দায়িত্ব নিতে হবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন ঢঙে লেখা বা শব্দের ভাঙাচোরা বিষয়টি স্বাভাবিক। প্রমিত ভাষার নির্দিষ্ট কিছু জায়গা আছে, লেখালেখিতে, বইপুস্তকে, অফিসে কিংবা সংবাদ পাঠে- এগুলোতে প্রমিত ভাষার ব্যবহার হতে হবে। কিন্তু ক্যাজুয়াল ঢঙে ইনফরমাল জায়গায় ভাঙাচোরা করলে এতে ভাষা সমৃদ্ধই হয়। অনেক সময় বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারও সম্ভব। ভাষার বিবর্তনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বা শরৎচন্দ্রের সময় এসে সহজ-সরল হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের সময় তা আরও সহজ-সরল হয়েছে। কিন্তু তার মানে এই না ভাষার পতন হয়েছে বা অপমান করা হয়েছে। নিজস্ব নিয়মেই এই পরিবর্তনগুলো হয়। সাইনবোর্ড ও পোস্টারে প্রমিত বাংলার ব্যবহার করতে হবে। কিশোর বয়সী যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচরণ করে তাদের বানান ও ভাষার বিষয় নিয়ে কিছুটা ভ্রম আছে। তারা বইয়ের ভাষা এক রকম করে শিখছে আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভিন্ন রকমভাবে দেখছে। এতে হয়তো ভাষার ‘ক্যাজুয়াল’ ব্যবহারের প্রতি তাদের আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে পাঠ্যপুস্তকে বা ফরমাল ভাষা শিাটা যেন সঠিকভাবে হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রমিত ভাষাকে দরকার। কিন্তু প্রমিতই একমাত্র শুদ্ধতার দাবিদার না।