খালেদা জিয়া যখনই যশোরে এসেছেন উপহার হিসেবে এনেছেন উন্নয়ন

যশোরে নাগরিক শোকসভা

0

মাসুদ রানা বাবু ॥ বিএনপি চেয়ারপারসন, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নাগরিক শোকসভায় যশোরের সর্বস্তরের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়া যখনই যশোরে এসেছেন, তখনই উপহার হিসেবে যশোরবাসীর জন্য উন্নয়ন নিয়ে এসেছেন। তিনি নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের নেত্রী ছিলেন। তিনি গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এবং রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্রকে সংহত করতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত আপোষহীন।

বক্তারা বলেন, দেশ যখনই কোনো সংকটে পড়েছে, তখনই তিনি জাতির সামনে আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি কেবল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ নয়, সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। তিনি গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধের অধিকারী এবং মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরির বাতাবরণ সৃষ্টির এক মহাঐক্যের জ্বলন্ত প্রদীপ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন বাঙালি থাকবে, যতদিন গণতান্ত্রিক আন্দোলন থাকবে, ততদিন বেগম খালেদা জিয়া সকলের হৃদয়ে থাকবেন।

সোমবার যশোরের টাউন হল মাঠে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পৌষের কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়ার নাগরিক শোকসভায় যশোরবাসীর সরব উপস্থিতিতে টাউন হল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কুরআন তিলাওয়াত এবং গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে নাগরিক শোকসভা শুরু হয়। জেলা বিএনপি এই শোকসভার আয়োজন করে।

বক্তারা আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কেবল বিএনপির নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। তিনি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্র রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী। স্বৈরাচার এবং আধিপত্যবাদীদের সাথে কখনো আপোষ করেননি, একারণেই তাকে আপোষহীন নেত্রী বলা হয়।

তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন তিনি আপোষহীন দেশনেত্রী; এটা এমনিতেই হয়নি। ফ্যাসিস্ট সরকার তার ওপর সর্বোচ্চ জুলুম-নির্যাতন করেছিল, আর দেশের মানুষ তাকে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার জীবন-সংগ্রাম থেকে আমাদের সকলকে শিক্ষা নিতে হবে।

তার অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করতে হবে। এ দায়িত্ব বিএনপি নেতাকর্মীদের। তারা যদি ঐক্য ধরে রাখতে পারে তাহলে জাতি আগামী দিনে সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবে। অন্যথায় জাতি আবারও পথ হারাবে।

অধ্যাপক নার্গিস বেগম স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রথম যশোরে এসে স্বাধীনতা উন্মুক্ত মঞ্চে জনসভা করেছিলেন তিনি। তখন বিএনপি শিশু অবস্থায় ছিল এবং আমরা রাজনীতিতে পরিপক্ক ছিলাম না। রাজনীতির কণ্টকময় পথে তিনি পা বাড়িয়েছিলেন গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। অকাল বৈধব্যের শোক কাটিয়ে দুটি শিশু সন্তানের দিকে না তাকিয়ে লক্ষ-কোটি জনতার পায়ে পা মিলিয়ে ধুলির জয়রথে গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা উড়িয়েছিলেন।

তার দূরদর্শী এবং আপোষহীন নেতৃত্বে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়ে সেদিন গণতন্ত্রের বিজয় অর্জিত হয়েছিল। মাত্র ১০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে বিজয় লাভ করে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর আসন অলংকৃত করেছিলেন। তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সামরিক শাসনে বিধ্বস্ত দেশ, ভঙ্গুর গণতন্ত্র, দুর্বল অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে সকল প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্তরণ ঘটিয়েছিলেন। তারই সময়ে দেশের রিজার্ভ বেড়েছিল। দেশকে তিনি এমন উচ্চতায় নিয়ে যান যে তার বদান্যতায় দেশ ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। বিশ্বব্যাংক তার অনুসৃত নীতির প্রশংসা করেছিল।

সমমর্যাদার ভিত্তিতে তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তিনি একমুখী নীতি থেকে বেরিয়ে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন। একক জায়গায় বন্ধুত্ব করে দেশকে সঠিক পথে রাখা যাবে না। পার্শ্ববর্তী দেশের আগ্রাসন থেকে সদা শিরদাঁড়া সোজা রেখেছিলেন। সীমান্ত রক্ষা হোক, পানি চুক্তি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য, সবক্ষেত্রে সমমর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’ সেই ডাক সেদিন আমরা বুঝি নাই, কিন্তু একটা সময়ে এসে তা প্রতিনিয়ত আমাদের হৃদয়ে অনুভূত হয়।

শত্রু-মিত্র চিনিয়ে দেবার ক্ষমতা ছিল তার। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়েছিলেন। প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসার বদলে তিনি সকলকে নিয়ে দেশকে নতুনভাবে গড়তে চেয়েছিলেন। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি চেয়েছিলেন। যারা দেশকে ভালোবাসি এবং গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি, তারা সকলেই বেগম খালেদা জিয়ার জীবন-সংগ্রামকে ধারণ করে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায় এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ (সদর) আসনের ধানের শীষ মনোনীত প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিছক কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা আর দশটা প্রধানমন্ত্রীর মতো নন।

তার সাথে সমগ্র দেশের মতো যশোরবাসীর নিবিড় সম্পর্ক রয়ে গেছে। আজ যশোরের যে প্রান্তেই আমরা তাকাই না কেন, তার উন্নয়নের অমর কীর্তি দেখতে পাই। যশোরের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট সকল অবকাঠামোর উন্নয়নে তার ভূমিকা রয়েছে। আমি শোকার্ত হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়েছি। এই মানুষটাকে দেখে এবং তার গল্প শুনে আমরা বড় হয়েছি। তাকে দেখে আমরা জীবন, পরিবার, ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছি। এই গল্প আমার একার নয়, এই যশোরের লাখো তরুণ-তরুণীর। তিনি শুধু বিএনপির নেত্রী ছিলেন না, বাংলাদেশের অভিভাবক ছিলেন। তাকে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় সকল মত-পথের মানুষ স্মরণ করবে। আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কর্মী হিসেবে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনোদিন আপোষ করব না।

শোকসভায় বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু জাফর, জেলা ইমাম পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি মুফতি আব্দুল মান্নান, বিশিষ্ট আইনজীবী এনামুল হক, যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি একরাম উদ দ্দৌলা, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আইয়ুব হোসেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুজ্জামান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ জেলা শাখার সম্পাদক তসলিম উর রহমান, রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বেনজিন খান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শ্যামল দাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) যশোর জেলা শাখার নেতা হারুন অর রশিদ, সিপিবি যশোর জেলা শাখার সভাপতি মাহবুবুর রহমান মজনু, জাতীয় নাগরিক পার্টি জেলা শাখার আহ্বায়ক নুরুজ্জামান, যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রশিদ বিন ওয়াক্কাস, উদীচী যশোর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু, আইইবি যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী রুহুল আমিন, জুলাই যোদ্ধা ও সিপিবি মনোনীত যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী রাশেদ খান প্রমুখ। পরে বেগম খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের সঞ্চালনায় শোকসভাটি অনুষ্ঠিত হয়।