‘কঠিন শর্তের বেড়াজালে’ বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে সরকারি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বেসরকারি রিজেন্ট হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর ভিত্তিতে অভিযান চালায় র‌্যাব। এরপর দেখা যায়, হাসপাতালটির অনুমোদনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৪ সালে, তারপর সেটি আর নবায়ন করা হয়নি। ২০১৮ সালের ৩০ জুনের আগেই লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ঢাকা ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। লাইসেন্স নবায়ন না করা পর্যন্ত হাসপাতালটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদফতর। একেরপর এক বেসরকারি হাসপাতালের অনুমোদন না থাকার সংবাদে উচ্চ আদালতে রিট হয়। শুনানিতে সেখানে বেসরকারি বড় বড় হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়ন না করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বারডেমের মতো বেশ কিছু বড় বড় হাসপাতালেরও লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি, তাহলে এখন এসব কীভাবে চলবে?
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা কেলেঙ্কারিসহ লাইসেন্স নবায়ন না থাকার ঘটনায় পর অধিদফতর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর লাইসেন্স নবায়ন করার বিষয়ে পদপে নিয়েছে। তারা আরও বলছে, প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক হলেও হাসপাতাল-কিনিকগুলো এসবের তোয়াক্কা করে না, নানাভাবে ‘ম্যানেজ’করে ফেলে সবকিছু। আর হাসপাতাল মালিকরা বলছেন, লাইসেন্স করা ও নবায়নের নতুন নিয়মে নানা ধরণের জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালে লাইসেন্স নেওয়া ও নবায়নের জন্য অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি চালু হয়। কিন্তু তাতে কোনও একটি শর্ত যদি পূরণ না হয় তাহলে রেজিস্ট্রেশন হয় না, নবায়নও হয় না। অনেকে ঠিকমতো শর্ত পূরণ করতে না পেরে আবেদন করছে না বলেও জানা গেছে। নওগাঁয় হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল ও হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল চলছে নিবন্ধন ছাড়াই। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পরিচালক আতাউর রহমান জানান, আগে বিভাগীয় সব শহর থেকে নিবন্ধন করা যেত। এখন শুধু ঢাকা থেকে নিবন্ধন করতে সমস্যা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিবন্ধন ফি বাড়ানোয় নিবন্ধন করতে বেগ পেতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। আর হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালের পরিচালক নাজমূল হুদা জুয়েল বলেন, ‘বর্তমানে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জন্য শর্তগুলো অনেক কঠিন। এছাড়া নিবন্ধন ফি জমা দেওয়া হলেও করোনার কারণে নিবন্ধনের কাগজ হাতে পাওয়া যাচ্ছে না।’ ২০১৭ সালের আগে কিনিকের নবায়নের জন্য শুধু ফিস জমা দিতে হতো পাঁচ হাজার টাকা, সঙ্গে ভ্যাট। যেটা এখন করা হয়েছে ২৫ হাজার টাকা, সঙ্গে রয়েছে ভ্যাট। আবার ডায়াগনস্টিক সেন্টার নবায়নে যেখানে আগে ছিল ভ্যাটসহ এক হাজার টাকা, বর্তমানে সেটা হচ্ছে ভ্যাটসহ ১৫ হাজার টাকা। যশোরের আধুনিক হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ‘অনলাইনে ফরমেটে নানা তথ্য সংযোজন করার বিষয়গুলো বুঝতে অসুবিধা হয়। আগে অ্যানালগ সিস্টেম ছিল। পূরণ করে সিভিল সার্জন অফিসে পৌঁছে দিলে তারাই ব্যবস্থা করতো।’ রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চারঘাট বাজার সংলগ্ন এলাকাগুলোতে গড়ে উঠেছে ১২টি বেসরকারি কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে একটি কিনিক ও একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন ও লাইসেন্স থাকলেও নেই হালনাগাদ নবায়ন। আর বাকি ১০টি বেসরকারি-কিনিক চলছে অনুমোদনহীন ও লাইসেন্স ছাড়াই। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশিকুর রহমান জানান, গত সপ্তাহে সিভিল সার্জনসহ এলাকার হাসপাতাল সংলগ্ন ও চারঘাট সদরে অবস্থিত সব বেসরকারি কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজপত্র তদন্ত করা হয়েছে। যেসব কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২৩ আগস্টের মধ্যে লাইসেন্স নিতে হবে অথবা নবায়ন করতে হবে। নতুবা এই সব অবৈধ বেসরকারি কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক-কিনিক মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাইসেন্স করা ও নবায়নের নতুন নিয়মে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে, অনলাইনে তথ্য সংযোজনের পর প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে আসতে কর্তৃপ দেরি করে। দীর্ঘসময় লাগে তাদের তদন্ত করতে আসতে এবং রিপোর্ট দিতে। আগে ১০ বেডের জন্য হাসপাতালের ফি ছিল পাঁচ হাজার, ডায়াগনস্টিকের জন্য এক হাজার টাকা। এখন এই দুটো মিলিয়ে প্রায় ৬৫ হাজার এবং ভ্যাট-ইত্যাদি দিয়ে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ফি দিতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ ছাড়পত্র, পৌরসভার সনদ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ছাড়পত্র, ভ্যাট-ট্যাক্স অফিসসহ ছয়-সাত জায়গার নিবন্ধন সংগ্রহ ও খরচে সমস্যা। একইসঙ্গে মালিকরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত রেট খুব বেশি বলে তারা মনে করেন। সাকুল্যে ২০-২৫ হাজার টাকা করা হলে ভালো হতো।
নিবন্ধনের সুবিধার জন্য তারা অনলাইনে আবেদনের পরপরই প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করার দাবি করছেন। নিবন্ধন অনেকেই করছে দাবি করে তারা বলছেন, গত এক বছর সরকারি জটিলতায় নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। ফি’র টাকা অতিরিক্ত বাড়ানো হয়েছে। ১০ শয্যার জন্যে তিন জন চিকিৎসক ও তিন জন ডিপ্লোমা নার্স থাকার কথা বলা হয়েছে। এটি তাদের কাছে সমস্যা মনে হয়েছে। ১০ বেডের জন্যে একজন চিকিৎসক করা হলে তাদের সুবিধা হয়। একইসঙ্গে অনলাইনে তথ্য সরবরাহে সবার জন্য আগে একটা ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হলে সুবিধা হতো। একইসঙ্গে ১০ শয্যার জন্য একজন চিকিৎসক ও তিন নার্স এবং ফি ২০-২৫ হাজারের মধ্যে করার কথা বলছেন তারা। ২০১৮ সালে লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি চালু হয়। কিন্তু তাতে কোনও একটি শর্ত যদি পূরণ না হয় তাহলে রেজিস্ট্রেশন হয় না, নবায়নও হয় না। অনেকে ঠিকমতো শর্ত পূরণ করতে না পেরে আবেদন করছে না বলেও জানা গেছে।
অধিদফতর বলছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি বেসরকারি হাসপাতাল-কিনিকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ। আর লাইসেন্সই নেই শতকরা ১০ শতাংশের। লাইসেন্স ছাড়াই এসব হাসপাতাল-কিনিক বাণিজ্য করছে বছরের পর বছর। মূলত ২০১৮ সালের পরই দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স করা এবং নবায়নে শিথিলতা আসে বলেও দাবি করছেন তারা। তবে এজন্য জনবল সংকটও কিছুটা দায়ী বলে মন্তব্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের। তারা বলছেন, হাসপাতাল ও কিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কেবল নোটিশ ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছাড়া আর কোনও পদপে নিতে পারে না স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরও বলছে, তাদের জনবল সংকটের কারণে সমস্যায় পড়তে হয়। বিভাগীয়, জেলা, উপজেলাসহ ঢাকার ভেতরে সিটি করপোরেশনের ভেতরে চারটি ক্রাইটেরিয়াতে পরিদর্শন টিম রয়েছে।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেসরকারি হাসপাতাল ও কিনিকের নিবন্ধন ফি এবং নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অপরদিকে, বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ থেকে ৫০ শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল ও কিনিকের নবায়ন ফি ৫০ হাজার টাকা, ৫১ থেকে ১০০ শয্যার জন্য এক লাখ টাকা, ১০০ থেকে ১৪৯ শয্যার জন্য দেড় লাখ টাকা, আর ২৫০ শয্যার জন্য নির্ধারণ হয় দুই লাখ টাকা। একইভাবে একই শয্যা সংখ্যা ধরে জেলা হাসপাতালগুলোর জন্য ধরা হয় ৪০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা ও এক লাখ টাকা। উপজেলা পর্যায়ে একই শয্যা সংখ্যা ধরে ফি নির্ধারণ হয় ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও এক লাখ টাকা করে। তবে এসব হাসপাতালে কমপে তিন জন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয় জন নার্স ও দুই জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকতে হয়। প্রতিটি শয্যার জন্য থাকতে হয় ৮০ বর্গফুট জায়গা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নারকোটিকসের লাইসেন্স থাকতে হবে। এরসঙ্গে আরও দরকার হবে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (টেক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর) ও বিআইএন (বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর), সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। তবে শয্যা সংখ্যা বেশি হলে আনুপাতিক হারে জনবল থাকতে হবে। আবেদনের ভিত্তিতে অধিদফতরের টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে লাইসেন্স দেবে। এসব শর্তের কারণে হাসপাতালগুলো লাইসেন্স নিতে পারছে না- জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আগে সবাইকে নিয়মের ভেতরে আনার জন্য। কে কোন ধাপে আটকে আছে সেগুলো বোঝার চেষ্টা করবো আমরা। তারপরও যাদের নবায়ন পেতে অসুবিধার জেনুইন গ্রাউন্ড রয়েছে সেটাও দেখবো। আর যারা উইলফুল ডিফল্ডার (ইচ্ছাকৃতভাবে লাইসেন্স এড়িয়ে যাচ্ছে) তাদের অবশ্যই পানিশমেন্টের আওতায় আনা হবে। তাহলেই অন্যরা দেখবে। আমরা সবাইকে একই আমব্রেলার ভেতরে আনবো। আসতেই হবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন যদিও অনেক শর্ত সরকার দিয়েছে নবায়নের জন্য, সেখানে পরিবেশের ছাড়পত্রসহ অনেক কিছু দরকার হয়। আমরাও বুঝি তাদের সময় লাগে। তারপরও যতই সময় লাগুক, তাদের নিয়মের ভেতরে আনতেই হবে এবং লাইসেন্স নবায়ন করতেই হবে। নাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লাইসেন্স ছাড়াও অনেক হাসপাতাল-কিনিক রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, তাদের সংগঠনের সদস্য ১০ হাজারের বেশি। যাদের লাইসেন্স নেই বা নবায়ন নেই তাদের বিরেদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরকে অনেক বার বলা হয়েছে, পত্রিকাতেও সংগঠনের প থেকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমরা অসংখ্যবার বলেছি অধিদফতরের দেওয়া শর্তগুলো সবার পে পূরণ করা সম্ভব না। যার কারণে সবাই লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেও না। ৫০ শতাংশ হাসপাতাল-কিনিকও লাইসেন্স রিনিউ করতে পারবে না। আর তাই যেসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব নয়, সেগুলো বাদ দিয়ে যেসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হবে সেগুলো দিয়ে শর্ত দেওয়া হোক।’ কিন্তু ২৩ আগস্টের ভেতরে লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য মন্ত্রণালয় সময় বেঁধে দিয়েছে তার কী হবে জানতে চাইলে ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘যারা পারবে তারা করবে। যারা পারবে না তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলবো।’