এমপি নাসিরের ৫ বছরে ঝিকরগাছার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

0

ঝিকরগাছা (যশোর) সংবাদদাতা॥ যশোর-২ (ঝিকরগাছা- চৌগাছা) আসনের ২০১৮-২৩ সময়ের সাবেক এমপি ডা. নাসির উদ্দিনের ৫ বছরে ঝিকরগাছার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের নামে কোটি কোটি টাকা অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে মুখ খুলতে শুরু করেছেন জিম্মি থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সংশ্লিষ্টরা। নিয়োগের নামে লোপাট হওয়া অর্থ প্রতিষ্ঠানে ফেরতের দাবি উঠেছে। ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া-মুকুন্দপুর আলিম মাদ্রাসা, মাটশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বালিয়াডাঙ্গা ইউপি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উজ্জলপুর মুক্তিযোদ্ধা দাখিল মাদ্রাসা, শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শ্রীরামপুর দাখিল মাদ্রাসা, গঙ্গানন্দপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শিওরদাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পৌদাউলিয়া দাখিল মাদ্রাসাসহ উপজেলার প্রায় সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার উজ্জলপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা দাখিল মাদ্রাসার সুপারসহ নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৫জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়েছে বলে দুনীতি দমন কমিশন, শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে মাদ্রাসায় গিয়ে সুপার বায়েজিত বোস্তামিকে পাওয়া যায়নি।
এ সময় শিক্ষার্থী সোহেল রানা বলেন, ক্ষমতাধর সুপারের নামে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দুর্নীতিবাজ সুপার অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা করার ফন্দি- ফিকির করে বেড়াচ্ছেন। সুপার বায়েজিত বোস্তামি নিয়োগে টাকা লেনদেনের বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হয়নি। তিনি ঢাকায় রয়েছেন বলে ফোন কেটে দেন।
অভিযোগ আছে, আদালতে মামলা থাকায় নিষেধাজ্ঞার ভেতরে বাঁকড়া-মুকুন্দপুর আলিম মাদ্রাসায় নিয়োগ বোর্ড করে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ একই পরিবারের ৪ জনসহ ৫জনকে ৪৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ০১/০৯/২০২২ ও ০১/১২/২০২২ তারিখে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের মূল হোতা অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হাফিজুর রহমান। একই প্রতিষ্ঠানে এই হাফিজুরের উপাধ্যক্ষ বড়ভাই জি এম আব্দুর রশিদ, অফিস সহকারী কাম হিসাবরক্ষক সালমান শাহ হাফিজুরের ছেলে, চতুথ শ্রেণির কর্মচারী আব্দুর রউফ হাফিজুরের শ্যালকের ছেলে।
নিয়োগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বর্তমান অধ্যক্ষ একেএম বিল্লাল হোসেন আজাদী বলেন, নিয়োগের সময় টাকা লেনদেন হয়েছে শুনেছি। তবে সেই লেনদেন হয়েছে বাইরে। আর নিয়োগের সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন হযরত আলী নামের একজন সহকারী শিক্ষক। শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে ০১/০৩/২০২২ তারিখে ও অফিস সহকারী, অপারেটর, অফিস সহায়ক ও আয়া পদে ২৪/০২/২০২২ তারিখে ৫ নিয়োগে প্রায় ৫৫ লাখ টাকার অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি।
৫৫ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়য়ে বর্তমান প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, সবই তো জানেন। সে সময় আমরা জিম্মি ছিলাম। তাছাড়া রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়ায় নিয়োগ বোর্ডের আগে আমরা প্রার্থীদের পর্যন্ত দেখিনি। চেয়ারে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করার ছিলনা। আর প্রধান শিক্ষক পদে তার পদায়নের কারণে সে সময় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের ১৭জন শিক্ষক, ৬জন কর্মচারী একই রুমে বসেন। নিয়োগের টাকা দিয়ে একটি কমনরুম করলেও শিক্ষক-কর্মচারীরা বসতে পারতেন। অপরদিকে মাটশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিরাপত্তাকর্মী, অফিস সহায়ক ও আয়া পদে বাঁকড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নিছার উদ্দীনের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৫০হাজার টাকা লেনদেন হয়েছিল বলে জানা গেছে।
এ বিষয় জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, তার এক প্রতিবন্ধী ভাইপোকে বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্যে কমিটিকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দেওয়া লেগেছে। তাকে অনেক হেনস্থাও হতে হয়েছে। যা তৎকালীন এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান অবগত ছিলেন। নিয়োগের এসব টাকা ফেরত নিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়নের কাজে লাগানোর দাবি তার। বালিয়াডাঙ্গা-উজ্জলপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরী, পরিছন্নতাকর্মী ও আয়াসহ ৪ পদের নিয়োগে ৩৫ লাখ টাকার অর্থবাণিজ্য হলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষোভের কারণে স্কুল উন্নয়নে ১০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল বলে সহকারী প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এম কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর বলেন, বিগত সরকারের আমলে নিয়োগ সংক্রান্ত কোন সিদ্ধান্তই তিনি নিতে পারেননি। নিয়োগের সময় স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যানরা যেভাবে বলেছেন সেভাবেই নিয়োগ হয়েছে। টাকা -পয়সা লেনদেন সব বাইরে থেকে হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিরা যাকেই চেয়েছেন, তাকেই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছেন।