ইসি’র প্রথম সংলাপ: ৩০ অতিথির ১৭ জনই যাননি

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য করণীয় ঠিক করতে ৩০ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। গতকাল বিকালে হওয়া প্রথম ধাপের এই সংলাপে আমন্ত্রিতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৩ জন। ইসির ডাকে সাড়া দেয়নি ১৭ জন শিক্ষক। নতুন ইসির প্রথম এই উদ্যোগে অনেকটা হতাশা ছড়িয়েছে। নির্বাচন ভবনে আয়োজিত সংলাপ চলে প্রায় দুই ঘণ্টা। আলোচনায় আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। তারা সবাই সামনের জাতীয় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে নির্বাচন কমিশনকে উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দেন। ইভিএম ব্যবহার না করারও পরামর্শ দিয়েছেন অনেকে। সংলাপে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ইসির আস্থা অর্জনের ওপর জোর দেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন বলতে পারেন, আমি কাজটা ঠিকমতো করতে পেরেছি।
এটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমি স্বপ্ন দেখি, একদিন এমন নির্বাচন হবে যেখানে জয়ী দল এবং হারা দল- দুটিই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হবে। ঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের ওপর জোর দিয়ে ইসি সদস্যদের উদ্দেশ্যে জাফর ইকবাল বলেন, ‘আপনারা যত ভালো কাজই করেন, গালি খেতেই হবে। তাই গালি নিয়ে ভাববেন না। দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে থাকে উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, ‘তারাও দেশ নিয়ে ভাবেন। তারা কীভাবে ভোট দিতে পারেন সেটা দেখতে হবে। ইদানীং দেখা যাচ্ছে অনেক জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল হচ্ছে। অনেকে অনেক টাকা খরচ করেও সমাধান পাচ্ছেন না। কমিশন এটা দেখলে এবং সমস্যার সমাধান করলে একটা পজেটিভ ইমপ্রেশন পড়বে। তিনি বলেন, ‘ইভিএম সম্পর্কে বলা হচ্ছে এটা নাকি অনেক হাই লেভেলের টেকনোলজি। আসলে তা না। এটা খুবই লো লেভেলের টেকনোলজি। এখন তো অনেক হাইটেক জিনিসপত্র আছে। আমাদের ভার্সিটির স্টুডেন্টরা ইভিএম নিয়ে প্রজেক্ট করে। শিক্ষকদের পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরাও আপনাদের সঙ্গে পুরোপুরি একমত, সমঝোতা লাগবে। ভালো নির্বাচন করাটা পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। স্টেক হোল্ডার যারা আছেন, তারাও যদি সমভাবে না আসে, নির্বাচনে রাজনৈতিক আবহ অনুকূল না হয়, দলগুলোর মধ্যে মোটামুটি সমঝোতা না থাকে, পক্ষগুলো বিবদমান হয়ে যায়, তাহলে আমাদের পক্ষে ভালোভাবে নির্বাচন করাটা দুরূহ। রাজনৈতিক সমঝোতাটা গুরুত্বপূর্ণ। সমঝোতা হলে ইসির কাজ সহজ হবে। হাবিবুল আউয়াল বলেন, কিছু কিছু রাজনৈতিক দলকে দেখছি, তারা কোনোভাবেই নির্বাচন কমিশনকে আস্থায় নিচ্ছে না। সব দল না এলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতায় কিছুটা ভাটা পড়ে যাবে। তিনি সবার আস্থা অর্জনে সচেষ্ট হওয়ার কথা বলেন। শিক্ষাবিদদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, আপনারা সহযোগিতা করবেন। দলগুলোকে এ বিষয়ে সচেতন করতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার বিষয়ে লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারেন। সিইসি বলেন, ভালো নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছার অভাব হবে না।
ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে সিইসি বলেন, ইভিএম নিয়ে কথা উঠেছে। এটা সম্পর্কে আমি ভালো বুঝি না। বোঝার চেষ্টা করছি। আমরা টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে এ বিষয়ে বসবো। এখানে যদি হ্যাকিং হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে তাহলে আমরা বিষয়টি ভেবে দেখবো। তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক দলগুলো ও মানুষকে নির্বাচনমুখী করতে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাব। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও আন্তরিক করতে মোটিভেট করার চেষ্টা করবো। প্রবাসী ভোটারদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে দেয়া যায় কিনা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেবো। শিক্ষকদের সঙ্গে সংলাপ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা গুরুত্ব-সহকারে শুনেছি। আমরা লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। আমরা এগুলো পরবর্তীতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা পর্যালোচনা মূল্যায়ন করে আমাদের তরফ থেকে কিছু করণীয় আছে কিনা সেগুলো আমরা নির্ধারণ করবো। তিনি বলেন, সব সাধ্য তো কখনই হয় না। জিনিসটা হয় আপেক্ষিক। আরও ভালো করতে হবে, আরও ভালো করা, আরও ভালো করা। আজকের আলোচনায় শিক্ষকরাও বলেছেন, কিছু দ্বিমত থাকবেই। সেটার অর্থ এই নয় অ্যাবসলুটলি পারফেক্ট করতে হবে। সেটা কিন্তু সম্ভব নাও হতে পারে, সম্ভব হবে না হয়তো। এর আগে সূচনা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, অতীতে বেশকিছু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এজন্য আগামী নির্বাচন যেন অধিকতর অংশগ্রহণমূলক হয়, প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক হয়- সে লক্ষ্যে সবার মতামত নিচ্ছে কমিশন। এই কমিশন নবগঠিত কমিশন। কমিশনের কাজ হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও লোকাল গর্ভমেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন করা।
সংলাপে অধ্যাপক জাফর ইকবাল, ড. এম আনোয়ার হোসাইন, প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, প্রফেসর এম আবুল কাশেম মজুমদার, অধ্যাপক সাদেকা হালিম, অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন, অধ্যাপক লায়লুফার ইয়াসমিন, প্রফেসর ড. এ এফ এম মফিজুল ইসলাম, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার, অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান, ড. নিয়াজ আহম্মেদ খান ও ড. বোরহান উদ্দিন খান অংশ নেন। সংলাপে আমন্ত্রণ পেয়েও অংশ নেননি, প্রফেসর ইমেরিটাস ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি, অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মো. আখতারুজ্জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য বিদায়ী ভিসি ড. ফারজানা ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আতিকুল ইসলাম, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ভিসি প্রফেসর ড. তানভীর হাসান, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউ ল্যাব) অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক ড. মোহাব্বত খান, অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের হোসেন, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অধ্যাপক ড. তাসলিম আরিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শামছুল আলম।