আগামী সপ্তাহেই দিল্লি সফরে যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন

0
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফরে যেতে পারেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি। সম্ভাব্য এই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, গঙ্গা পানিবণ্টনসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনার আশা করা হচ্ছে।। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে আগামী সপ্তাহের শেষ ভাগে কিংবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতের নয়াদিল্লি যেতে পারেন তারেক রহমান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে সামনে রেখে ঢাকা ও নয়াদিল্লি—উভয় রাজধানীর কূটনৈতিক পাড়াতেই জোর প্রস্তুতি চলছে।

সফরটি নিয়ে দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে আজ তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফর নিয়ে প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে।

নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
এনডিটিভি জানিয়েছে, সম্ভাব্য এই দুদিনের সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। সব ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটাই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।

বৈঠকটিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা বিষয়, বিশেষ করে বাণিজ্য, পরিবহন ও যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের আগামীর গতিপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই আলোচনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আমন্ত্রণ ও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ
গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে নয়াদিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস (BRICS) আউটরিচ সেশনেও অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরণের টানাপোড়েন ও বৈরী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করায় সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। সম্পর্কের নতুন গতি সঞ্চারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে:

এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।

১০ আগস্ট ২০২৬: ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, যেখানে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার ও উন্নয়নের বিভিন্ন উপায় নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও সাম্প্রতিক বিতর্ক
দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও আলোচিত ইস্যু হলো ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার হস্তান্তরের বিষয়টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সরকার পতনের পর ভারতে আশ্রয় নেন এবং বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশের একটি ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হওয়ার পর ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে ফেরত দেওয়ার জন্য দিল্লির প্রতি আহ্বান জানায়। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের এই আবেদনটি তাদের আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে চলতি মাসের (৫ আগস্ট) শুরুর দিকে শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি মতবিনিময় করলে নতুন করে বিতর্ক ও ক্ষোভ তৈরি হয়। ঢাকা এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ভারতের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয়।

ভারত সরকার অবশ্য উক্ত অনুষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেছে। গত ১০ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বৈঠকেও প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গটি উঠে আসে।

পানি চুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সহযোগিতা
রাজনৈতিক ইস্যুতে বিরোধ থাকলেও দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু সমাধানহীন বাস্তবমুখী সমস্যা রয়েছে, যা এই সফরে গুরুত্ব পেতে যাচ্ছে:

১. গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন: ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরেই (২০২৬) শেষ হতে যাচ্ছে। সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসায় চুক্তিটি নবায়নের ইস্যুটি আসন্ন শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

২. বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা: অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে এবং বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য ভারতের কাছ থেকে আরও সহযোগিতার প্রত্যাশা করছে ঢাকা।

৩. কৌশলগত সীমান্ত ও ট্রানজিট: শুধু দীর্ঘ অভিন্ন সীমানার কারণেই নয়, বরং ভারতের ভূ-বেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও দৃঢ় সম্পর্ক রক্ষা নয়াদিল্লির কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।

নতুন কৌশলগত সমীকরণের পরীক্ষা
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উভয় দেশই যখন তাদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ধারায় ফেরাতে আগ্রহী, ঠিক তখনই এই সফরের তোড়জোড় চলছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, একটিমাত্র সফরেই দীর্ঘদিনের জট লেগে থাকা সব সংকটের রাতারাতি সমাধান আশা করা ঠিক হবে না; শেখ হাসিনার অবস্থান, পানিবণ্টন ও বাণিজ্য নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনার প্রয়োজন পড়বে।

তবে এই সফর বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে ঢাকার দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পাবেন এবং অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্যও বাংলাদেশের নতুন সরকারের কাছ থেকে নয়াদিল্লির প্রত্যাশাগুলো বিনিময়ের স্পষ্ট পথ উন্মুক্ত হবে।