অক্টোবর মাসেও যশোরের বাজারে শীতের আগাম সবজির আকাল, চড়া দাম

0
ছবি: সংগৃহীত।

আকরামুজ্জামান ॥ অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়। অন্যান্য বছর ঠিক এ সময়ে যশোরের বাজারগুলোতে শীতকালীন আগাম সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাকসহ নানা ধরনের সবজিতে ভরে ওঠে বাজার। কিন্তু এবার চিত্র ভিন্ন।

বাজারে শীতের আগাম সবজির কাঙ্ক্ষিত সরবরাহ নেই। কিছু সবজি পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে বাড়তি দামেই সবজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। চাষি ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হতে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এর আগে সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনাও কম।

চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টির কারণে শীতকালীন সবজির আবাদ ব্যাহত হয়েছে। জমিতে লাগানো অনেক সবজির চারা বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে নতুন করে চারা রোপণ করতে হয়েছে কৃষকদের। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তত তিন দফা চাষের পরিকল্পনা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হয়েছে অনেককে।

ফলে নির্ধারিত সময়ে সবজি উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে বাজারের সরবরাহে, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে সবজির দাম।

যশোর সদর উপজেলার নোঙরপুর মাঠের সবজি চাষি সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এই এলাকাজুড়ে মূলত সবজি চাষই বেশি হয়। অন্য বছর এই সময়ে ক্ষেতের বাঁধাকপি, ফুলকপি, মুলা ও পালংশাক বাজারে তুলে ভালো লাভ পেতাম। কিন্তু এবার আগাম চাষের প্রথম দফায় পানি না পাওয়ায় সময়মতো সবজি চাষ শুরু করতে পারিনি।’ তার মতে, উৎপাদন পিছিয়ে যাওয়ায় আগাম সবজি বাজারে সরবরাহ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

একই মাঠের কৃষক সোহাগ হোসেন জানান, গত সপ্তাহে ক্ষেতে বাঁধাকপি ও ফুলকপির চারা রোপণের পর বৃষ্টিতে অনেক চারার ক্ষতি হয়েছে। যেসব স্থানে চারা মারা গেছে, সেখানে আবার নতুন করে চারা লাগাতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘একদিকে বৈরী আবহাওয়া, অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বেশি। এর সঙ্গে শ্রমিকের অতিরিক্ত মজুরি যোগ হওয়ায় আমরা বেশ নাজুক অবস্থায় আছি।’

সবজি চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, বাজারে সবজির দাম সহসা কমার সম্ভাবনা নেই। তার মতে, সবজির চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহের ঘাটতি পূরণের অন্যতম উপায় হলো আগাম জাতের শীতকালীন সবজি উৎপাদন। কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এবার কৃষকেরা পিছিয়ে পড়েছেন। অতিরিক্ত গরমের কারণে শিমের ক্ষেতে পোকার আক্রমণও বাড়ছে, এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এদিকে বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ কম থাকায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা জানান, পাইকারি বাজার থেকে চাহিদা অনুযায়ী সবজি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ফলে খুচরা বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে পালংশাক, মুলা, বাঁধাকপি ও ফুলকপি এলেও পরিমাণে কম।

বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে সবজির ধরন, মান ও বাজারভেদে দামে পার্থক্য রয়েছে।

বাড়তি দামে সবজি কিনতে গিয়ে চাপের মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের মতে, প্রতিদিনের খাবারে সবজি অপরিহার্য হলেও বেশি দামের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যান্য বছর এ সময়ে শীতের আগাম সবজি তুলনামূলক সহজলভ্য থাকলেও এবার বাজারে এসে সেই স্বস্তি মিলছে না।

সরবরাহ না বাড়লে দাম কমার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর। তত দিন পর্যন্ত যশোরের বাজারে শীতের আগাম সবজি কিনতে ভোক্তাদের বাড়তি দাম গুনতে হতে পারে। আবহাওয়ার বার্তা আগাম সতর্ক করেছে নিকটতম সময়ে বৃষ্টির প্রভাব নিয়ে। বৃষ্টি হলে সবজির আবারো ক্ষতি হতে পারে।

যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের, ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। সবজি চাষ মূলত আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। মৌসুমের বৃষ্টির কারণে কৃষকদের চাষাবাদ পিছিয়ে যাওয়ায় বাজারে সবজি আসতেও দেরি হচ্ছে। তবে জেলার বিস্তীর্ণ মাঠে যে পরিমাণ সবজির আবাদ হয়েছে, তাতে সবজির ঘাটতি হবে না বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।