আধুনিক কাতারের রূপকার শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যু

0
আধুনিক কাতারের রূপকার শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি। সংগৃহীত ছবি

লোকসমাজ ডেস্ক॥ কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি, যিনি দেশটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি ছোট উপসাগরীয় রাষ্ট্র থেকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী দেশে পরিণত করার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিলেন, ৭৪ বছর বয়সে মারা গেছেন।
১৯৯৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি কাতারের ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সূচনা করেন। বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান এবং শিক্ষা, অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে বন্ধুসুলভ ও ক্যারিশমাটিক নেতা হিসেবে পরিচিত শেখ হামাদকে আধুনিক কাতারের প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার নেতৃত্বেই কাতার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন শুরু করে।
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির শাসনামলেই কাতার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব যাত্রা শুরু করে। তার নেতৃত্বে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ২৪ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র নর্থ ফিল্ড থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে কাতারকে ২০০৬ সালের মধ্যেই বিশ্বের শীর্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করা হয়। চার বছর পর দেশটির বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি ৭০ লাখ টনে পৌঁছে যায়।
২০১৩ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে শেখ হামাদ বলেছিলেন, “ভবিষ্যৎ তোমাদের সামনে অপেক্ষা করছে। এই দেশের নতুন প্রজন্মই নতুন যুগের নেতৃত্ব দেবে এবং উন্নয়নের পতাকা বহন করবে।” ওই সময় তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তার পুত্র, ব্রিটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত যুবরাজ শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে, যার বয়স তখন ছিল ৩৩ বছর।
মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন সাধারণত মৃত্যু, অভ্যুত্থান বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাধ্যমে ঘটে, সেখানে স্বেচ্ছায় ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ঘটনা ছিল বিরল।
তার শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত হয় কাতার ফাউন্ডেশন, ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয় কাতারের প্রথম স্থায়ী সংবিধান। একই সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের ভোটাধিকার ও প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
শেখ হামাদের নেতৃত্বেই কাতার কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০ গ্রহণ করে এবং ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব অর্জন করে, যা দেশটির আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে দোহায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হামাদ। তিনি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত রয়েল মিলিটারি একাডেমি সান্ডহার্টস থেকে সামরিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে কাতারের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৭ সালে তিনি যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন কাতারের আমির হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রায় ১৮ বছর দেশ পরিচালনার পর ২০১৩ সালের ২৫ জুন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তার ছেলে ও বর্তমান আমির তামিম বিন হামিদ আল থানিরর কাছে। তার নেতৃত্বেই আধুনিক, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী কাতারের ভিত্তি গড়ে ওঠে।