চতুর্থ স্বামী খুন, তৃতীয় স্বামীর ঘরে পুঁতে রাখা লাশ : পর্দার আড়ালে অর্থ, প্রতারণা ও সম্পর্কের জট

শার্শায় গোয়ালঘরে পুঁতে রাখা লাশ উদ্ধার: চতুর্থ স্বামীকে হত্যা করে তৃতীয় স্বামীর স্বীকারোক্তি

0
শার্শায় গোয়ালঘরে পুঁতে রাখা লাশ উদ্ধার: চতুর্থ স্বামীকে হত্যা করে তৃতীয় স্বামীর স্বীকারোক্তি
যশোরের শার্শায় ইকরামুল হত্যাকান্ডে আটক মুন্নি আক্তার, তার তৃতীয় স্বামী আল ফরহাদ, পিতা ফজলু ওরফে ফজু মোড়ল ও কাকলী আক্তার – লোকসমাজ

মীর মঈন হোসেন মুসা, লোকসমাজ :
যশোরের শার্শা উপজেলার বসতপুর গ্রামে এক মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন ইকরামুল কবির। পরিবার ভেবেছিল—হয়তো কোথাও চলে গেছেন কিংবা অপহরণের শিকার হয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে নির্মম সত্য বেরিয়ে এলো, তা রীতিমতো চাঞ্চল্যকর।
নিখোঁজের এক মাস পর উদ্ধার হলো তার মরদেহ—তাও আবার একটি গোয়ালঘরের মাটির নিচ থেকে। আর সেই গোয়ালঘরটি ছিল নিহতের স্ত্রীর তৃতীয় স্বামী আল ফরহাদের।
তদন্তে উঠে এসেছে বহুস্তরীয় সম্পর্ক, গোপন বিয়ে, অর্থ লেনদেন এবং প্রতারণার অভিযোগ। পুলিশ বলছে, নিহত ইকরামুল ছিলেন মুন্নি আক্তারের চতুর্থ স্বামী। আর তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মুন্নির তৃতীয় স্বামী আল ফরহাদ।
এক নারীর চার বিয়ে, কেউ জানতেন না কারও কথা
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বসতপুর এলাকার বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী মুন্নি আক্তার একাধিক বিয়ে করলেও স্বামীরা একে অপরের বিষয়ে অবগত ছিলেন না।
পুলিশের ভাষ্যমতে, মুন্নির প্রথম স্বামী ইমদাদুল, দ্বিতীয় ইয়াহিয়া, তৃতীয় আল ফরহাদ এবং সর্বশেষ স্বামী ছিলেন ইকরামুল কবির।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি সম্পর্কের পেছনেই ছিল আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ। বিয়ের পর স্বামীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মুন্নির বিরুদ্ধে।

নিহত ইকরামুল ও অভিযুক্ত মুন্নি আক্তার- সংগৃহীত ছবি

প্রেম, বিয়ে নাকি পরিকল্পিত ফাঁদ?
নিহতের পরিবার দাবি করেছে, চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি কৌশলে ইকরামুল কবিরকে কাজী অফিসে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন মুন্নি আক্তার।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন কৌশলে ইকরামুলের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পাশাপাশি আরও দুই বিঘা জমি মুন্নির নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
ইকরামুলের পরিবার জানায়, এসব বিষয়ে আপত্তি করায় তাকে নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
গত ৮ এপ্রিল রাতে বড় বোনের বাড়ি থেকে ফেরার পথে নিখোঁজ হন ইকরামুল।
আদালতের মামলার পর তদন্তে মোড়
ইকরামুলের নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা আব্দুর রশিদ পুত্রবধূ মুন্নি আক্তারসহ চারজনের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে শার্শা থানায় নিয়মিত মামলা রেকর্ড হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চঞ্চল কুমার বিশ্বাস জানান, তদন্তে আল ফরহাদের সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। পরে তাকে আটক করলে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন তিনি।
তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যায় আল ফরহাদের গোয়ালঘরের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় ইকরামুল কবিরের মরদেহ।
‘ঘুমের ওষুধ মেশানো জুস’—পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যা মিলেছে
শার্শা থানার ওসি মো. মারুফ হোসেন জানান, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে—ইকরামুলকে কৌশলে বাড়িতে ডেকে নেওয়া হয়। পরে তাকে ঘুমের ওষুধ মেশানো জুস পান করানো হয়।
জুস পান করার পর অচেতন হয়ে পড়লে দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় তাকে। এরপর মরদেহ গোপনে গোয়ালঘরের মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় আল ফরহাদ, মুন্নি আক্তার, তার পিতা ফজলু ওরফে ফজু মোড়ল এবং কাকলী আক্তারকে আটক করা হয়েছে।
এর মধ্যে আল ফরহাদ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এলাকায় চাঞ্চল্য, প্রশ্ন তদন্ত নিয়েও
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বসতপুর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক ও অর্থকেন্দ্রিক বিরোধের নানা গুঞ্জন থাকলেও এমন ভয়াবহ পরিণতির কথা কেউ ভাবেননি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়; এর পেছনে আর্থিক প্রতারণা, একাধিক গোপন বিয়ে এবং পরিকল্পিত হত্যার উপাদান রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।