অপচয় কমিয়ে বিশ্বদরবারে নতুন বাংলাদেশ

জাতিসংঘ সফরে ব্যয়সংযম ও কার্যকর কূটনীতির বার্তা

0
অপচয় কমিয়ে বিশ্বদরবারে নতুন বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান- ফাইল ফটো

শৈবাল রহমান : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে ঘিরে অতীতে প্রায়ই বড় সফরসঙ্গী দল, দীর্ঘ কর্মসূচি এবং উচ্চ ব্যয়ের আলোচনা সামনে এসেছে। তবে এবার সেই চিত্র থেকে ভিন্ন একটি বার্তা দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে রাখা হয়েছে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত, কর্মসূচিনির্ভর এবং প্রয়োজনভিত্তিক।

সফরের মূল লক্ষ্য থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা, বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান স্পষ্ট করা। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও অতিরিক্ত ব্যয় এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয় নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময়সীমা দীর্ঘ হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা পুনর্বিন্যাস করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার পর দ্রুত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘ অবস্থানের পরিবর্তে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সফরের প্রতিটি দিনের সঙ্গে নিরাপত্তা, প্রটোকল, যাতায়াত, আবাসন ও প্রশাসনিক ব্যয়ের বিষয় জড়িত। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সময়সীমা নির্ধারণ ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ব্যয়সংযমের নীতির প্রতিফলন

সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারি ব্যয় কমানো, অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা এবং জনস্বার্থে রাষ্ট্রীয় অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগকে সেই নীতিরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও প্রভাব ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন ও ফলাফলকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার একটি বার্তা হিসেবে এই সফরকে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে সরকারের অগ্রাধিকার

সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট, কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপসহ একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। সরকারের দাবি, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং উৎপাদনমুখী পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তির প্রবণতা দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ এখনো পুরোপুরি কমেনি। তাই আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজারে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন গ্যাসকূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার, এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগও চলমান রয়েছে।

শিল্প ও বিনিয়োগে গুরুত্ব

শিল্পখাত সচল রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখছে সরকার। গ্যাস, বিদ্যুৎ, ঋণ, আইনশৃঙ্খলা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী হয় এবং রাজস্ব আয়ও বাড়ে। ফলে বেসরকারি খাতের পুনরুজ্জীবন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক সুরক্ষা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষ, কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবারকে সহায়তার আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাঠপর্যায়ের সমস্যা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালুর বিষয়টিও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার

২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, উন্নয়ন অগ্রাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

অপচয় কমিয়ে বিশ্বদরবারে নতুন বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান – ফাইল ফটো

জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সম্ভাবনাও রয়েছে। এসব বৈঠকে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রেও জাতিসংঘ অধিবেশনকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চায় বাংলাদেশ।

নতুন বার্তার বাংলাদেশ

সব মিলিয়ে এবারের জাতিসংঘ সফরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কার্যকর কূটনীতি, ব্যয়সংযম এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দীর্ঘ সফর ও বড় বহরের পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সরকার একটি নতুন বার্তা তুলে ধরতে চায়—রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা।

বিশ্বসভায় বাংলাদেশের এই বার্তার মূল সুর হতে পারে—অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নয়, বরং জনস্বার্থ, কার্যকর কূটনীতি এবং বাস্তব ফলাফলই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার অগ্রাধিকার।