সরকার বদলেছে, বদলায়নি বিপিসির ব্যবসায়ী বলয়

0

লোকসমাজ ডেস্ক : সরকার পরিবর্তনের পর জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক কাঠামোয় নানা পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি আমদানিতে দীর্ঘদিনের একটি ব্যবসায়ী বলয়ের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিপিসির দরপত্র, কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তালিকাভুক্ত কয়েকটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিসির পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির বড় একটি অংশের কার্যাদেশ এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব ডা. এজাজুর রহমানের মালিকানাধীন সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানিতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ, সরবরাহ নিরাপত্তা এবং ব্যয় কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গড়ে ওঠা কিছু ব্যবসায়িক যোগাযোগ সরকার পরিবর্তনের পরও পুরোপুরি ভাঙেনি। তবে এ ধরনের সম্পর্ক নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়; প্রশ্নটি মূলত বাজারে প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে।

বিপিসির নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের জন্য তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক সংযোগ রয়েছে এজাজ-সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। এর মধ্যে সেভেন মার্কের সঙ্গে ইউনিপেক সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড এবং ইন্দোনেশিয়ার পিটি বুমি সিয়াক পুসাকু (বিএসপি-জাপিন) যুক্ত রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজের সঙ্গে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কোম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া ও সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনাল অয়েলের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রায় ৫৫ লাখ ১০ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ লাখ টন জ্বালানির কার্যাদেশ এমন প্রতিষ্ঠান পেয়েছে, যাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ এজাজ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ আছে। পরিমাণের হিসেবে এটি মোট কার্যাদেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ।

তবে শুধু কার্যাদেশের পরিমাণ বেশি হওয়াই অনিয়মের প্রমাণ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে মূল্য, গুণগত মান, সরবরাহ সক্ষমতা, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং দরপত্রের শর্তসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত প্রশ্নটি হলো—বাজারে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা রয়েছে কি না এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি দরপত্র প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে প্রতিযোগিতা ব্যাহত করে, তবে সেটি গুরুতর বিষয়। অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

সব মিলিয়ে বিপিসির জ্বালানি আমদানিতে নির্দিষ্ট একটি ব্যবসায়ী বলয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দরপত্রে প্রতিযোগিতা, প্রিমিয়াম নির্ধারণ এবং সাবেক কর্মকর্তাদের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব কতটা, সে বিষয়েও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।