২০২৭ সালে আসছে নির্ভুল নতুন পাঠ্যবই, যুক্ত হবে ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস

ইতিহাসের ‘বিচ্যুতি’ সংশোধন, যুক্ত হবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস

0
২০২৭ সালের নতুন পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রম নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন এনসিটিবি চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী- বাসস

লোকসমাজ ডেস্ক : আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ইতিহাসগত বিচ্যুতি ও একপেশে উপস্থাপন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী।

তিনি বলেন, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের কাজ চলছে। অতীতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের যেসব বিচ্যুতি ঘটেছে, সেগুলো বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে সংশোধন করা হচ্ছে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে বীর নায়কদের অবদান যথাযথভাবে পাঠ্যবইয়ে স্থান পাবে। ইতিহাসের একপেশে স্বীকৃতির পরিবর্তে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের বিস্তারিত ইতিহাসও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”

তিনি জানান, মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের অংশ হিসেবে গত ৪ থেকে ৭ মে বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে চার দিনব্যাপী নিবিড় আবাসিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে প্রাথমিক স্তরের বই পরিমার্জনের কাজও চলছে।

মাহবুবুল হক পাটওয়ারী জানান, মাধ্যমিকের ৯৭টি এবং প্রাথমিকের ৩৬টি বই পরিমার্জনে প্রায় ৩২০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক এবং অভিজ্ঞ স্কুলশিক্ষক রয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই সব বই পরিমার্জনের কাজ শেষ করে মুদ্রণের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ইংরেজি ভার্সনসহ মোট ৬০১টি পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ২০২৭ সালের শুরুতেই নির্ভুল ও আধুনিক বই হাতে পায়।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ এবং পড়াশোনাকে আনন্দদায়ক করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন তিনটি বৈচিত্র্যময় বই যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান এনসিটিবি চেয়ারম্যান।

চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘খেলাধুলা ও সংস্কৃতি’ বিষয়ক একটি বই প্রণয়ন করা হচ্ছে। শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল আসক্তি কমাতে সাতটি গেমসের ভিত্তিতে বইটি সাজানো হচ্ছে।

এছাড়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি বই চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। পর্যায়ক্রমে এটি অন্যান্য শ্রেণিতেও সম্প্রসারণ করা হবে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিই) বিষয়েও একটি উদ্দীপনামূলক বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আইসিটি বইয়ের বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান বইগুলো অনেকটাই পুরোনো হয়ে গেছে। তাই ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির আইসিটি বইগুলো নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তিনি বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমের মূল দর্শন হবে ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা’। এতে বইয়ের সংখ্যা কমবে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৮ শিক্ষাবর্ষে আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রয়েছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন কারিকুলামে রূপ নিতে পারে।

অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা বর্তমানে ২০১২ সালের কারিকুলাম অনুসরণ করছি। শিক্ষার্থীরা যখন আনন্দের সঙ্গে শিখবে, তখন অভিভাবকরাও সেটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবেন।”

সবশেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারির প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের বিচ্যুতিমুক্ত, নির্ভুল ও আধুনিক পাঠ্যপুস্তক হাতে পাবে।