রাড্ডার ঘটনায় সংরক্ষিত নারী এমপির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি

0
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছিল।। ছবি: সংগৃহীত

এমপি মিষ্টির বিরুদ্ধে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে বিএনপি। এমনকি তাঁকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টিও দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।

বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূত্রসহ দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মোট চারটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তবে এ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) কাছে জানতে চাইলে তিনি বুধবার রাত ১০টায় প্রথম আলোকে জানান, তিনি তখন পর্যন্ত পদত্যাগ–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা পাননি এবং এ বিষয়ে কিছু শেনেননি।

"রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায়
দলীয় ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে
কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।" 
— 
সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাড্ডার ঘটনা নিয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুই দিন ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন—এসব বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় দলীয় ওই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে বলে বুধবার জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, তদন্তে যার নামই আসুক, সরকার তার বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র বলেছে, রাড্ডার ঘটনাটি দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেওয়া, লুটপাট এবং জমি দখলের অভিযোগের সঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে সরকার বিব্রত।

ঘটনার সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসার পর তাঁর ভূমিকা ও রাজনৈতিক দায়ও আলোচনায় এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যের বিষয়েও কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

"অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে এবং
তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।" 
— 
মাহদী আমিন, মুখপাত্র ও উপদেষ্টা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

অনুসন্ধানে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়া এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা অন্যতম, যাঁরা এলাকায় ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

রাড্ডা সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর কার্যক্রমেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন যুক্ত বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং সমিতির নামে জায়গা বরাদ্দের আবেদনে সই করেছিলেন।

তবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ফেরদৌসী আহমেদ জানান, বর্তমানে সমিতিটির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তিনি হামলা ও ভাঙচুরে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এদিকে রাড্ডার ঘটনা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই দিনে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়।

মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাটের পর গুঁড়িয়ে দেয়।। ছবি: সংগৃহীত

এর মধ্যে শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কু রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কার্যকলাপসহ সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কথা বলা হলেও বিজ্ঞপ্তিতে রাড্ডার ঘটনার সরাসরি সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়নি। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া বলে জানানো হয়েছে।

সরকারের অবস্থানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সরকার দুঃখিত ও বিব্রত এবং তদন্তে সম্পৃক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এর পরদিন বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সচিবালয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। এর আগে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য রয়েছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ১২টার দিকে মিরপুর ১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই শতাধিক ব্যক্তি অস্ত্র ও ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে ঢুকে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ, টিকা ও টাকাসহ মালামাল লুট করে এবং একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে সমিতির সাইনবোর্ড টাঙায়।

১৯৭৪ সাল থেকে কেন্দ্রটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে এবং ভবন ভাঙার পরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পরিষেবা চালু রাখা হয়েছে।

হামলা ও ভাঙচুরের চার দিন পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সংস্কারকাজ দ্রুতগতিতে পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার জানান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সহায়তায় কাজ এগোচ্ছে এবং গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া গেছে। শাহ আলী থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শামসুল কবির জানান, সাত দিনের মধ্যে সংস্কারের ঘোষণা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।