সবুজ আবাসনেই কমবে ঢাকার জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়বে সাশ্রয়ী ও টেকসই নগরায়ন

0

বিশেষ প্রতিনিধি : রাজধানী ঢাকায় একটি বাসা শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মস্থলে যাতায়াত, বিদ্যুৎ-পানির খরচ, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য নগর রেখে যাওয়ার প্রশ্ন। তাই কম দামে একটি ফ্ল্যাট কিনলেই সেটিকে সাশ্রয়ী আবাসন বলা যায় না। বসবাসের পুরো সময়জুড়ে বিদ্যুৎ, পানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও যাতায়াত ব্যয়ের বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব বসতি দিবস-২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। এই প্রতিপাদ্য শুধু আবাসনের প্রাপ্যতাকেই নয়, বরং টেকসই নগরায়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার আবাসন সংকট মোকাবিলায় এখন সবুজ ও সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণের ধারণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

শুধু ফ্ল্যাটের দাম নয়, হিসাব করতে হবে পুরো জীবনচক্রের ব্যয়

আবাসনের প্রকৃত সাশ্রয় নির্ধারণে শুধু ফ্ল্যাটের মূল্য বা ভাড়া নয়, বিদ্যুৎ, পানি, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত এবং যাতায়াত ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। কর্মস্থল থেকে দূরে কম ভাড়ার বাসা নিলেও প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ সেই সাশ্রয়কে অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। একইভাবে অপরিকল্পিত ভবনে আলো-বাতাসের স্বল্পতার কারণে বাড়তি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, যা বিদ্যুৎ বিল বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই ‘লাইফ সাইকেল কস্ট’ বা জীবনচক্র ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি পরবর্তী ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছরে বিদ্যুৎ, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণে কত ব্যয় হবে, সেটিও একটি ভবনের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করে।

গ্রিন বিল্ডিং মানেই অতিরিক্ত ব্যয় নয়

বাংলাদেশে এখনও অনেকের ধারণা, পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণে বিপুল অতিরিক্ত ব্যয় প্রয়োজন। তবে বাস্তবে সঠিক নকশা, ভবনের অভিমুখ নির্ধারণ, প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার, ছায়া সৃষ্টির ব্যবস্থা এবং স্থানীয় উপকরণের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে তুলনামূলক কম ব্যয়েই সবুজ ভবন নির্মাণ সম্ভব।

ওয়ার্ল্ড গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, পরিকল্পিতভাবে শক্তি ও পানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ালে দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

দেশীয় বাস্তবতায় HBRI-DESH Framework

বাংলাদেশের জলবায়ু, দুর্যোগঝুঁকি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (HBRI) তৈরি করেছে HBRI-DESH Framework। এর পূর্ণরূপ Design for Environment and Sustainable Habitats (DESH)।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এবং জাতিসংঘ প্রকল্প সেবা কার্যালয় (UNOPS)-এর সহযোগিতায় তৈরি এই কাঠামো দেশীয় বাস্তবতায় সবুজ ভবনের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোটির ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে দেশে টেকসই আবাসন উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।

ড্যাপে সবুজ ভবনের জন্য বাড়তি সুবিধা

রাজউকের সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী সবুজ ভবনের জন্য অতিরিক্ত ০.৫ FAR (Floor Area Ratio) সুবিধা রয়েছে।

এছাড়া সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত FAR সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডেভেলপার ও ভবনমালিকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা পরিবেশবান্ধব আবাসন নির্মাণে উৎসাহ জোগাবে।

পুরোনো ভবনেও সম্ভব সবুজায়ন

সবুজ আবাসনের ধারণা শুধু নতুন ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিপুলসংখ্যক পুরোনো ভবন সংস্কার বা রেট্রোফিটিংয়ের মাধ্যমে শক্তি ও পানি ব্যবহারে আরও দক্ষ করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে HBRI-DESH Framework ছাড়াও EDGE এবং LEED-এর মতো আন্তর্জাতিক সনদায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ভবনকে দক্ষ করে তোলা নতুন ভবন নির্মাণের তুলনায় আরও বেশি পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

সচেতনতা ও অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবুজ ভবনের প্রসারে এখনও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রাথমিক ব্যয় বেশি হওয়ায় ডেভেলপার ও ক্রেতারা আগ্রহ হারান।

তাই কম সুদের ঋণ, সহজ অর্থায়ন, কর-প্রণোদনা এবং অতিরিক্ত FAR সুবিধার মতো নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সবুজ আবাসন ও পুরোনো ভবনের জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ ঋণ কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

টেকসই ঢাকার পথে সবুজ নির্মাণ

বিশ্বব্যাপী ভবন ও নির্মাণ খাত কার্বন নিঃসরণ এবং জ্বালানি ব্যবহারের বড় উৎস। Global Status Report for Buildings and Construction 2025-2026 অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বের যে ভবনসমষ্টি থাকবে তার প্রায় অর্ধেক এখনও নির্মিত হয়নি।

দ্রুত নগরায়ণের পথে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি একটি বড় সুযোগও। কারণ আজ যে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটিই আগামী কয়েক দশক মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব নির্ধারণ করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভবিষ্যৎ আবাসন নীতিতে সবুজ নকশা, জীবনচক্র ব্যয়, দেশীয় মূল্যায়ন কাঠামো, প্রণোদনা এবং সহজ অর্থায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন ভবনের পাশাপাশি পুরোনো ভবনগুলোকেও আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে হবে।

সবুজ নির্মাণ কেবল পরিবেশ রক্ষার উপায় নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর পথ। তাই ঢাকার ভবিষ্যৎ আবাসন হতে হবে কম ব্যয়ের, কম কার্বনের এবং সবার নাগালের মধ্যে থাকা একটি টেকসই আবাসন ব্যবস্থা।