শুল্কমুক্ত মদ ‘অবৈধ গুদামে’, সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ৪ গুদাম সিলগালা

0
অননুমোদিত গুদামে বন্ড সুবিধায় আমদানিকৃত শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের মালিকানাধীন 'টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড'-এর চারটি গুদাম সিলগালা করেছে যৌথ তদন্ত দল।। ছবি: সংগৃহীত

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত মদ ‘অননুমোদিত’ দুই গুদামে মজুত রাখার অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের দুটি বৈধসহ চারটি গুদাম সিলগালা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার গভীররাতে দক্ষিণ গুলশানের বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এ এক যৌথ অভিযানে সেসব সিলগালা করা হয় বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। প্রাথমিকভাবে ‘গুরুতর অসংগতি’ পাওয়ায় ‘অধিকতর যাচাইয়ের জন্য’ ওয়্যারহাউজগুলো সিলগালা করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দার এক কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে চারটা পর্যন্ত এ অভিযান চলে।

"সালমান মুক্তাদির এখানে ইস্যু নয়।
সব গোয়েন্দা সংস্থাই আগে থেকে কাজ করছিল।
তা থেকে কিছু প্রমাণও মিলেছে।"
 — 
কর্মকর্তা, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)

এনবিআর বলছে, কোম্পানিটির ‘অনুমোদিত’ বা ‘ঘোষিত’ গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু অভিযানে দেখা গেছে—সেখানে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুত রাখা হয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য অননুমোদিত গুদামে স্থানান্তর বা অপসারণ রোধ এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়েছে। বর্তমানে তদন্ত ও বিস্তারিত ‘যাচাই কার্যক্রম’ চলমান রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউজ’ থেকে কেবল বাংলাদেশে কর্মরত কূটনীতিক এবং আইন অনুযায়ী বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের শুল্কমুক্ত মদ কেনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু টস বন্ডের বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ ওঠায় তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই অনুসন্ধান চলছিল।

এনবিআরের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকেও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে। তাতে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের সেখানে নাগরিকত্বসহ ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন ও অন্তত চারটি কোম্পানির মালিকানা থাকার অস্তিত্ব মিলেছে। সেখানকার গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঢাকার এ বন্ডেড ওয়্যারহাউজের পরিচালক হিসেবে নাম আছে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম ও মেয়ে তাসনিম ইসলামের।

"বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য 
অননুমোদিত গুদামে স্থানান্তর বা অপসারণ রোধ এবং
সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে
প্রতিষ্ঠানটির চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়েছে।"
 — 
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)

দেশে থাকা মদ ও বারের ব্যবসায় নানা অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি কানাডায় নুর ইসলাম ও তার পরিবারের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য ও সম্পদ মেলার খোঁজ পেয়ে তদন্ত করে আসছিল কর আদায়ের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তবে সম্প্রতি ঢাকায় নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ক্ষমতাসীনদের দায়ী করার পর তদন্ত কার্যক্রমের গতি বাড়ে।

কানাডা থেকে যেসব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট, তাতে ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নুরুল ইসলামের পরিবারের লেনদেনের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। খতিয়ে দেখা হয়েছে সেই সময়ের মোট ১৬৩টি আর্থিক প্রতিবেদন।

সেখানে ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের ১৭টি, ‘সন্দেহজনক’ লেনদেনের চেষ্টার দুটি, ‘বড় অঙ্কের’ নগদ লেনদেনের ১১৮টি, ‘ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক-ইএফটিএন’ মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের প্রতিবেদন ২৬টি এবং আন্তদেশীয় অর্থ লেনদেনের দুটি নথির খোঁজ মিলেছে। এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিটেন্স আনার তথ্যও মিলেছে। সিআইসি, আয়কর গোয়েন্দা ও এনবিআরের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তবে তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই অভিযান সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক ‘ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়’। সিআইসির একজন কর্মকর্তা জানান, সালমান মুক্তাদির এখানে ইস্যু নয়, সব গোয়েন্দা সংস্থাই আগে থেকে কাজ করছিল এবং তা থেকে কিছু প্রমাণও মিলেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের যৌথ তদারকি প্রক্রিয়া ।। ছবি: সংগৃহীত

আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, নুর ইসলামের মদের ব্যবসা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিলই। এরমধ্যে তার ও তার পরিবারের বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য পাওয়া যায় যা কর নথিতে ছিল না। যেহেতু এখানে আয়কর, ভ্যাট ও আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের ব্যাপার আছে, তাই সবাই মিলে কাজ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ও। এরপর ফেসবুকে লাইভে সালমান মুক্তাদির ঘটনার জন্য ‘বিএনপির চাঁদাবাজিকে’ দায়ী করেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করেও নানা মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে সরে আসেন এ কনটেন্ট ক্রিয়েটর।

তবে ঘটনার পর নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া যে মামলা করেছেন, তাতে জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে হামলা চালানোর কথা বলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনকে, যেখানে অজ্ঞাতনামা আসামি ১৫০ থেকে ২০০ জন। মামলায় এখন পর্যন্ত গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইলেকট্রনিক সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করে বিএফআইইউ।

বিডিনিউজ২৪